সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৭ শ্রমিকের মৃত্যু

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় কাজ করার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৭ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে উপজেলার ভাটিয়ারি ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের একটি কারখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। একই ঘটনায় আরও অন্তত তিনজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

সকাল ৯টার দিকে স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে থাকা শ্রমিকেরা গ্যাসের সংস্পর্শে এলে দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। তারা সবাই ভাটিয়ারি এলাকার বাসিন্দা। অপর নিহত শ্রমিকের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

জাহাজের ভেতরেই গ্যাসে আক্রান্ত শ্রমিকেরা

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানার ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়া গ্যাসের গন্ধ আশপাশের এলাকাতেও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র ছিল যে কারখানার পাশের খালে নৌকা নিয়ে ঢুকতেও সমস্যায় পড়েন জেলেরা।

সাগর থেকে ইলিশ ধরে ফেরার পথে কয়েকটি মাছ ধরার নৌকাকে স্বাভাবিক ঘাটে না গিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে অবস্থান নিতে হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। কারখানার আশপাশে গ্যাসের তীব্র গন্ধ থাকায় নৌকাগুলো ওই পথ দিয়ে এগোতে পারেনি।

শ্রমিকদের চিৎকার শুনে ছুটে যান স্থানীয়রা

এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, শুক্রবার সকালে হঠাৎ কারখানার ভেতর থেকে শ্রমিকদের চিৎকার শোনা যায়। পরে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় কয়েকজন অসুস্থ শ্রমিককে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

জাহাজের ভেতরে কয়েকজন শ্রমিক মারা গেছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে কিছু লোক কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তীব্র গ্যাসের গন্ধে নৌকা নিয়ে এগোতে পারেননি জেলেরা

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তাদের দুটি নৌকা সাগর থেকে ইলিশ ধরে উপকূলের দিকে ফিরছিল। কিন্তু কারখানার কাছাকাছি আসার পর তীব্র গ্যাসের গন্ধ পাওয়ায় তারা ওই পথ ধরে সামনে এগোতে পারেননি। পরে নৌকাগুলো অন্য জায়গায় ভেড়াতে হয়।

এতে বোঝা যায়, কারখানার ভেতরে জমে থাকা গ্যাসের প্রভাব শুধু জাহাজের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না; আশপাশের এলাকাতেও এর তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

কারখানা মালিকের বক্তব্য

ফেরদৌস স্টিলের মালিক মো. মহিউদ্দিন জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি কারখানায় ছিলেন না। পরে কারখানা থেকে তিনি ঘটনাটি জানতে পারেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজের ভেতরে থাকা ছয় থেকে আটজন শ্রমিক অসতর্কতাবশত বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন।

তিনি জানান, আক্রান্ত শ্রমিকদের মধ্যে চার থেকে পাঁচজন মারা গেছেন এবং প্রায় তিনজন আহত হয়েছেন। তবে পরে হাসপাতালে নেওয়া শ্রমিকদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে জানা যায়।

হাসপাতালে নেওয়ার পর পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ফেরদৌস স্টিল কারখানা থেকে ছয়জন শ্রমিককে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকেরা তাদের মধ্যে পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে জাহাজের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের কথা উঠে এসেছে।

নিহত শ্রমিকদের পরিচয়

  • সানি জলদাস — ২২ বছর
  • পলাশ জলদাস — ২৭ বছর
  • মনসুর আলী — ৪০ বছর
  • নাসির উদ্দিন — ৩৮ বছর
  • অপর নিহত শ্রমিকের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি

নিহত চারজনই ভাটিয়ারি এলাকার বাসিন্দা বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। দুর্ঘটনায় আহত আরও শ্রমিককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা

কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে কারখানার ভেতরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

শুক্রবার সকালে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় জাহাজভাঙা কারখানার শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার বিষয়ে মূল তথ্য হিসেবে এখন পর্যন্ত জাহাজের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টিই সামনে এসেছে।