সবাই তাকে চেনে বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে। তবে অন্যান্য গাছ লাগালেও বটবৃক্ষের প্রতিই তার টান বেশি। পরিবেশ রক্ষা এবং বটগাছের প্রতি ভালোবাসা থেকে দীর্ঘ তিন যুগ ধরে রাস্তার দুই পাশে এবং পরিত্যক্ত জায়গায় বটগাছ লাগিয়ে যাচ্ছেন পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ইদ্রিস আলী খান।
তিনি জানান, কোনো কিছু পাওয়ার জন্য নয়- ভালো লাগে তাই গাছ লাগান। নিজের সবকিছু বিলিয়ে রাস্তার ধারে গাছ লাগিয়ে চলেছেন। এ পর্যন্ত শুধু বটগাছই লাগিয়েছেন চার শতাধিক। বাকি জীবনও গাছ লাগিয়ে যেতে চান তিনি।
ইদ্রিস আলীর গাছ লাগানোর যেমন কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই, তেমনি চারা সংগ্রহেও কোনো নির্দিষ্ট বন্দোবস্ত নেই। পুরনো ভবন, তালগাছের মাথা এবং দূর-দূরান্ত থেকে বটবৃক্ষের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। আর সেগুলো রোপণ করেন স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, হাট-বাজার, কবরস্থান, সড়ক পাশে কিংবা পরিত্যক্ত জায়গায়।
ইদ্রিস আলী জানান, বটগাছ ছাড়াও তাল, খেজুর, আম, জাম, মেহগনি, কৃষ্ণচূড়া, বকুল ফুলের গাছ লাগান। ডাক পেলে অন্যের বাড়িতেও গাছের কলম বেঁধে দিয়ে আসেন খুশি মনে। বটগাছ লাগানোর নেশা তাকে এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে- এ জীবনে বিয়ে করা হয়নি। সংসার, ছেলেমেয়ে নেই, তাই সন্তানের মমতায় গাছকে ভালোবাসেন তিনি। গাছের ছায়াতলে মানুষ বিশ্রাম নেয়। পাখিরা গাছের ফল খায়। এগুলো দেখতে তার ভালো লাগে।
ঘূর্ণিঝড় সিডরে সুন্দরবনে গাছপালার প্রচুর ক্ষতি হয়েছিল- সে খবর জেনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন মানুষটি। সামর্থ্য হলে সুন্দরবনে গিয়ে গাছ লাগানোর ইচ্ছা তার।
বেঁচে থাকার জন্য দর্জির কাজ করলেও ইদ্রিস আলী খানের আসল নেশা রাস্তার দুই পাশে এবং বিভিন্ন খালি জায়গায় বটগাছ লাগানো। এভাবে নিজ উদ্যোগে ৩৬ বছর ধরে বটগাছ লাগিয়ে চলেছেন তিনি। দর্জির কাজ করে প্রতিদিন যা উপার্জন করেন তা দিয়েই বটগাছ লাগান। অবশ্য এখন আর আগের মতো প্রতিদিন কাজ জোটে না।
বর্তমানে ইদ্রিস আলী সপ্তাহে দুইদিন (শুক্র ও মঙ্গলবার) গ্রামের হাটে লুঙ্গি সেলাই করেন এবং সে অর্থ দিয়েই বটগাছের চারা লাগানো ও তার রক্ষণাবেক্ষণ চলে। প্রয়োজনের তুলনায় আয় খুবই কম, তবু বটগাছ লাগানো থেমে থাকেনি গাছপাগল মানুষটির।
মাত্র চার বছর বয়সে বাবা বাদশা খানকে হারান ইদ্রিস আলী খান। এরপর ভাইদের সংসারে মানুষ হয়েছেন। ১৯৭৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর আর লেখাপড়া করেননি। ১৮-১৯ বছর বয়সে বাড়ির আশপাশে গাছ লাগানো শুরু করেন। এরপর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম, কবরস্থান, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, অফিস, হাট-বাজার, বিভিন্ন রাস্তার মোড়, ঈদগাহ মাঠ ও খালি জায়গায় গাছ লাগানো শুরু করেন।
বটগাছ লাগানো সম্পর্কে ইদ্রিস আলী খান বলেন, প্রায় ২৫ বছর আগে বাড়ির পাশে বিশাল বটগাছটি ঝড়ে ভেঙে যায়। এতে খুব মন খারাপ হয়েছিল। পুরো এলাকাকে গাছশূন্য মনে হতো। তখনই সেখানে একটি বটগাছ লাগিয়ে দিলাম।
মনে খুব শান্তি লাগল। এরপর দেখি গ্রামের ঈদগাহ মাঠের পাশে খালি জায়গা। সেখানেও একটি বটগাছের চারা লাগালাম। একদিন ফরিদপুর উপজেলা চত্বরে ঢুকতেই জায়গা দেখে খালি খালি লাগল। সেখানে চারা লাগালাম। এভাবেই শুরু। প্রতিটি গাছ লাগানোর পর ভাবি, আর গাছ লাগাব না। কিন্তু পছন্দমতো জায়গা দেখলেই মাথা খারাপ হয়ে যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত বটের চারা না লাগাতে পারি ততক্ষণ শান্তি পাই না।
তিনি আরো বলেন, মনের শান্তির জন্য বটের চারা লাগাই। মা মারা যাওয়ার পর একদিন রেডিওতে ‘বটবৃক্ষের ছায়া যেমন, মায়ের স্নেহ লাগে তেমন’ গান শুনে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম। সেখান থেকেও বটগাছ লাগানোর অনুপ্রেরণা পাই। এখনো বটগাছ দেখলে মায়ের কথা মনে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ফরিদপুর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলজুড়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইদ্রিস আলী খানের লাগানো শত শত বটগাছ। পরম মমতায় তিনি গাছগুলো লাগিয়েছেন এবং বড় করে তুলেছেন। চারা লাগানোর পর বাঁশ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘিরে দেন। চারার গোড়ায় মাটি দেন। এর পর একনাগাড়ে সাত দিন চারায় পানি দেন।
শুধু বটগাছ লাগান কেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফলের গাছ রাস্তায় লাগালে ঝগড়া-বিবাদ দেখা দিতে পারে। মানুষের জায়গায় ফলের গাছ লাগানো ঝামেলার ব্যাপার। এছাড়া ফলের গাছ বড় হলে মরে যায়। বটগাছ অনেক দিন বাঁচে। বটগাছের ডালপালা মানুষকে ছায়া দেয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বটগাছ বেশি ভালো। আমাদের দেশে এক সময় অনেক বটগাছ ছিল। তাই বটগাছ লাগালে আমি আলাদা শান্তি পাই, যা অন্য গাছে পাই না।
দেওভোগ বটতলায় বিশ্রাম নেয়ার সময় বনওয়ারীনগরের ইছুব আলী মোল্লা বলেন, গাছপাগল ইদ্রিস আলীকে সবাই এক নামে চেনে। গাছ ছাড়া তিনি কিছুই বোঝেন না। বিয়ে-সাদি কিছুই করলেন না। গাছই তার ছেলেমেয়ে।
চার ভাই ও সাত বোনের মধ্যে ইদ্রিস আলী খান মেজো। ভাই-বোনেরা সবাই সংসার পেতেছেন। কিন্তু গাছের প্রেমে পড়ে সংসার করা হয়নি ইদ্রিসের। আয়ের উৎস বলতে দর্জির কাজ। যা আয় করেন তার প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেন গাছের জন্য। গরু, ছাগলের আক্রমণ থেকে গাছ বাঁচাতে খাঁচা কিনতে হয় তাকে। এরপরও গাছটি যখন বড় হয়ে ওঠে- তখন সুখ অনুভব করেন।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গাছ লাগাতে চান ইদ্রিস আলী। তার ভাষায়, ‘গাছের মধ্যি মায়া আছে, ছায়া আছে। গাছের দমেই আমরা দম পাই, তাই গাছের বিকল্প নাই। সগলেরই বেশি বেশি গাছ লাগানো উচিত। তালি দেশটা ছায়াঘেরা হবি। শান্তিত নিশ্বাস নেওয়া যাবি।’
পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুল কাদের জানান, ইদ্রিস আলী খান গত তিন যুগে চার শতাধিক বট গাছ লাগিয়েছেন। শুধু বট গাছ নয়, তিনি অন্যান্য গাছও লাগিয়েছেন।
বৃক্ষপ্রেমী মানুষটি কৃষি ও জীববৈচিত্র রক্ষায় বিরাট অবদান রেখেছেন। তিনি আজ বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। এরপরও জীবনের শেষ সম্বল দিয়ে গাছের পরিচর্যা করেন। তবে তার জীবনের পরিচর্যা হয়নি। একটু চিকিৎসার জন্য যে টাকা দরকার তাও নেই। সমাজের হৃদয়বান মানুষজন সহযোগিতার হাত বাড়ালে তিনি সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবেন।
চাটমোহরের ইউএনও জেসমীন আরা জানান, নীরবে নিভৃতে যুগের পর যুগ ইদ্রিস আলী খান নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন দেশের জন্য, মানুষের জন্য। তিনি জীববৈচিত্র রক্ষায় যে অবদান রেখেছেন আর্থিক মানদণ্ডে তা পরিমাপ করা অসম্ভব। সাদা মনের এ মানুষটি আজ অসহায়।
ইউএনও আরো জানান, ইদ্রিস আলী খানের জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করবেন। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষকেও গাছপ্রেমী ইদ্রিস আলী খানের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হবে। তাহলেই বাকি জীবনটা সুন্দরভাবে কাটবে ইদ্রিস আলী খানের।
