যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন মালেক-সেতারা দম্পতি। যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন তার সংসারের হাহাকার তীব্র হচ্ছে। খাবার নেই , মা’থা গোজার ঠাই নেই, অ’সুস্থ ছানিপড়া স্বামীর জন্য নেই চিকিৎসার খরচ।
তবুও রোদ, বৃষ্টি এবং তীব্র শীতও তার পথচলা দমাতে পারেনি।কখনো শাক-সবজির দোকান আবার কখনো চায়ের দোকান। দু’মুঠো খাবারের জন্য ১৯৯০ সালের দিকে হাতে নিয়েছিলো ভিক্ষার ঝুলি। অ’পরদিকে ঋণের বোঝা তার মা’থায়। প্রতি সপ্তাহে গুনতে হচ্ছে ব্যাংকের কিস্তি।
ঝালকাঠির রাজা’পুরের শুক্তগড় ইউপির কেওতা গ্রামের আব্দুল মালেক এবং স্ত্রী’ সেতারা বেগম তাদের জীবনের ক’ষ্টের কথাগুলো এভাবে জানালেন।সেতারা বেগম জানান, স্বামী মালেক আনুমানিক ৪০ বছর আগে গাছ থেকে পড়ে অ’সুস্থ হন। শারিরীকভাবে অক্ষম হওয়ায় দিনমজুরি বা অন্য কোনো কাজও করতে পারছেন না। রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাভাবে উন্নত চিকিৎসা না করাতে পারায় আর সুস্থও হতে পারেন নি। চার-পাঁচ মাস আগে থেকে মালেকের চোখে ছানি পড়ে। ফলে স্বাভাবিক দৃষ্টি শক্তিও হারান তিনি।
৩৩ শতাংশ জমি থাকলেও অর্থাভাবে সেখানে ঘর তৈরি করতে পারেননি। বর্তমানে তারা থাকেন উপজে’লার বাগরী এলাকার রুহুল আমিনের পরিত্যক্ত জমিতে একটি পলিথিনের চালার ঝুপড়ি ঘরে। বিনা ভাড়ায় ছয় বছর ধরে ওই ঘরেই বসবাস করে আসছেন তারা।
সেতারা বেগম আরো জানান, তার সংসারে অর্থাভাব দেখা দিলে প্রথমে তিনি ২/৩ বছর ভিক্ষা করেন। অষ্টম শ্রেণি পাস সেতারা ভিক্ষাবৃত্তি ভালো না বুঝতে পেরে ভিক্ষা করা ছেড়ে দিয়ে দুই ছে’লে ও স্বামীকে নিয়ে খুলনায় চলে যান। সেখানে তিনি অ’সুস্থ স্বামীকে সঙ্গে নিয়েই প্রায় আট বছর শাক-সবজি বিক্রয়ের ব্যবসা করেন। ওই ব্যবসায় সংসার ভালো না চালাতে পেরে সেখান থেকে বরিশালের এসে রুপাতলি এরাকায় একটি চায়ের দোকান দেন।
বরিশালে থাকতে মাঝে মাঝে বাড়িতে আসতেন তারা। বসতভিটায় বাঁশ খুটির একটি ঘরছিলো তাদের। সংসার চালাতে ক’ষ্টহলে বাড়িতে এসে গ্রামীন ব্যাংক থেকে লোন নেন সেতারা। সঠিক সময়ে কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় ঋণের পাল্লা ভা’রী হতে থাকে। বৃদ্ধি পায় কিস্তি পরিশোধের পরিমাণও। ২০০৭ সালের সিডরে তছনছ হয়ে যায় তাদের ঘরটি। এরপরে ভাড়া থাকেন রাজা’পুরের বিভিন্ন স্থানে।
এরইমধ্যে তাদের দুই ছে’লে হু’মায়ুন কবির ও সুমন বিয়ে করেন। তারা বর্তমানে আলাদা সংসার নিয়ে থাকছেন। তারা দুইভাই রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বাবা মাকে খাওয়ানোর মতো সাম’র্থ্য নেই তাদেরও। ছোট ছে’লে সুমনঅ’সুস্থ বাবা মালেককে তার কাছে নিতে চাইলে মালেক তার স্ত্রী’ সেতারাকে ছেড়ে শেষ বয়সে কোথাও যেতে চাচ্ছেন না। মালেক চোখে না দেখলেও সেতারা বাজারে শাক-সবজি বিক্রির সময় সেতারার হাত ধরে এসে দোকানের পাশেই চুপ করে বসে থাকেন। অদৃশ্য মায়ার বন্ধনে একে অন্যের পরিপূরক তারা।
ওই ঝুপড়ি ঘরে থেকে সেতারা প্রতিদিন বিকালে গ্রামে গ্রামে হেটে হেটে অল্পদামে হরেক রকম শাক-সবজি কিনে এনে সপ্তাহের সাতদিনই রাজা’পুরের হাট ও বাজারে বিক্রি করেন। সেই আয়ের টাকা দিয়ে নিজেদের খাবার, স্বামীর প্রতি মাসে ২/৩ হাজার টাকার ওষুধ ও সপ্তাহে ১২শ’ টাকা কিস্তি পরিশোধ করেন।সেতারা বলেন, সরকারের কোনো আর্থিক সহায়তা পেলে বা বিনা সুদে টাকা পেলে একটি দোকান দিয়ে একটু ভালো’ভাবে জীবনযাপন করতে পারতাম।
অ’সুস্থ মালেক জানান, অনেক দৌড়ঝাপ করে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করিয়েছি। তীব্র শীতে খুব ক’ষ্টে ঝুপড়ি ঘরে থেকেছি, কেউ কোনো খোঁজ নেয়নি। পাইনি এক টুকরা শীতবস্ত্রও। শুনছি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে গৃহহীনদের ঘর দেয়াহচ্ছে। আমা’র সেতারাও স্থানীয় মেম্বার মনিরের কাছে ঘর পাওয়ার জন্য গিয়েছিল। তিনি আমাদের কোনো কাগজপত্র নেয়নি। পরে শুক্তাগড়ের ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুল হক মৃধার কাছে কাগজপত্র দিয়েছি। আমাদের একটি ঘরের খুবই প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, আমা’র চোখে ছানি পড়েছে। আমি দুই চোখেই ঝাপসা দেখছি। ডাক্তার বলেছেন, অ’পারেশন করাতে পারলে চোখে দেখতে পাবো। অ’পারেশন করাতে প্রায় ৬/৭ হাজার টাকা লাগবে। অর্থাভাবে অ’পারেশন করাতে পারছি না।এ বিষয়ে স্থানীয় মনির মেম্বার বলেন, আমা’র কাছে মালেক বা সেতারা কখনোই আসেনি। কে কোথায় থাকে কিভাবে জানবো? আমা’র কাছে আসলে আমি তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করবো।
চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, সেতারা-মালেক দম্পতি খুবই অসহায় অবস্থায় আছেন। তাদের একটি ঘরের খুব প্রয়োজন। ঘর পাওয়ার জন্য পিআইও অফিসে তাদেরকে একটি দরখস্ত করতে বলা হবে।এ বিষয়ে ইউএনও মো. মোক্তার হোসেন বলেন, যাদের জমি নাই ও ঘর নাই, তাদেরকে জমিসহ ঘর দেয়া হচ্ছে। দ্বিতীয় পর্যায় যাদের জমি আছে ঘর নাই, তাদেরকে ঘর দেয়া হবে। মালেকেরতো জমি আছে। তাই দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হলে যাচাই বাছাই করে ঘর পাওয়ার উপযু’ক্ত হলে তাকে ঘর দেয়া হবে।
