প্রতিদিন টানা আঠারো ঘণ্টা কাজ। বিনিময়ে তিন বেলা খেতে দেওয়া হতো শুকনো রুটি। আর রাত হলে গৃহক’র্তার মনোরঞ্জন করা ছিল নিত্যদিনের কাজের অংশ। শুধু গৃহক’র্তাই নন, মনোরঞ্জনের নামে পাশবিক নি’র্যাতন চালাত ঘরের প্রায় সকল পুরুষ। এক ঘরে কাজ করার কথা থাকলেও করতে হতো তিন ঘরে। কাজে অনীহা দেখালে কিংবা অ’সুস্থ হলে গৃহকর্তীর মা’র খেতে হতো। এমন নি’র্যাতন সহ্য করতে হয়েছে টানা আড়াই মাস।
নরক যন্ত্র’ণার কথা বলতে বলতে কণ্ঠ আড়ষ্ঠ হয়ে আসছিল সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা কোহিনুরের (ছদ্মনাম)। ২০১৮ সালের জুনে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সেখানে যান তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন।
ভয়ংকর অ’ভিজ্ঞতার কথা জানালেন সৌদি ফেরত আরেক গৃহকর্মী তানিয়া (ছদ্মনাম)। দুই বছর কাজ করার চুক্তিতে ৫০ হাজার টাকায় বিনিময়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গৃহক’র্তার শারীরিক ও মানসিক নি’র্যাতন চার মাসের বেশি টিকতে দেয়নি তাকে। বেতন চাইলে কিংবা বাড়ি ফেরার কথা বললে খাবার দেওয়া হতো না। ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে বাঁচতে হয়েছে তানিয়াকে। গৃহকর্তী রাগ করে একদিন ছাদ থেকে ধাক্কা মে’রে ফেলেও দেন। এতে নিচে পড়ে গিয়ে পা ভেঙে হাস*পাতালে ভর্তি ছিলেন। আর সেখান থেকেই তিনি পালিয়ে বাঁচেন। তানিয়া জানান, নিজের গড়া সুখের সংসার, স্বামী-সন্তান রেখে আরেকটু ভালো থাকার জন্য সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ফিরেছেন যে ক্ষত নিয়ে তা সারাজীবন ভুলতে পারবেন না।
এমন হাজারও নারীর রয়েছে লোমহর্ষক অ’ভিজ্ঞতা; যা পারছেন না ভুলতে কিংবা কারও কাছে প্রকাশ করতে। শুধু সৌদি আরব নয়, লেবানন, জর্ডান থেকেও নারী কর্মীরা ফিরছেন এমন অ’ভিজ্ঞতা নিয়ে।
উন্নত জীবনের আশায় প্রতি বছর পরিবার-পরিজন ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে দেশ ছাড়ছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী শ্রমিক। কিন্তু দালাল আর রিক্রুটিং এজেন্সির খপ্পরে পড়ে তারা একদিকে যেমন সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সহ্য করছেন নরক যন্ত্র’ণা। গৃহকর্মী, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজের কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিয়ে যাওয়া হলেও বেশিরভাগই শারীরিক, মানসিক ও যৌ’ন নি’র্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের ওপর নেমে আসে পাশবিক নি’র্যাতন। সে নি’র্যাতনে কেউ ফিরছে লা’শ হয়ে, কেউ পঙ্গু হয়ে, আবার কেউ কেউ ফিরেছেন দুঃসহ মানসিক যন্ত্র’ণা নিয়ে।
আর যারা ফিরতে পারেননি তারা নি’র্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি আরবে ডেপুটেশন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর দিন কা’টাচ্ছেন। ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া নারীদেরকে জো’রপূর্বক দেওয়া হচ্ছে সেই নিয়োগক’র্তার কাছে অথবা মক্তবে (সৌদি রিক্রুটিং এজেন্সির অফিস)। নারী শ্রমিকদের অ’ভিযোগ, দূতাবাস এ বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করছে না।
এমন পরিস্থিতির শিকার সৌদি আরবে অবস্থানরত এক নারী বিউটি বেগম। তার সঙ্গে কথা হয় ইমোতে। তিনি জানান, নরক যন্ত্র’ণা সহ্য করছেন সেখানে। নিয়োগক’র্তার নি’র্যাতনের হাত থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ডেপুটেশন ক্যাম্পে। কিন্তু ক্যাম্প কর্তৃপক্ষও সেখানে তাদের নানাভাবে টর্চার করছে।
প্রতিবাদ করলেই মা’রধর করছে তাদের। এখানে আশ্রয় নেওয়া অনেক মেয়েকে নিয়োগক’র্তার কাছে আবার পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসে অ’ভিযোগ করেও এর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। নি’র্যাতনের শিকার কয়েকশ’ বাংলাদেশি নারী বর্তমানে মক্তবে আশ্রয় নিয়েছে। এ বিষয়ে সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলেও কর্মক’র্তারা সাড়া দেননি।
অ’ভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ৯ মাসে সৌদি আরব থেকে নি’র্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন ৯৫০ জন নারী শ্রমিক। আর প্রবাসী কল্যান ডেক্সের তথ্যমতে, গেল কয়েক মাসে দেশে ফিরেছেন ১ হাজার ২৫০ জন নারী কর্মী। অ’ভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নি’র্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা নারীদের পুনর্বাসন করতে হবে। আর এ দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘শুধু নি’র্যাতন নয়। অনেক নারী গর্ভবতী হয়েও দেশে ফিরছেন। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, দেশে ফিরে আসার পর এসব নারীকে তাদের পরিবার গ্রহণ করতে চায় না। এমনকি সমাজও নয়।’
সম্প্রতি অ’ভিবাসী কর্মী উন্নয়ন সংস্থা (ওকাপ) একটি গবেষণা করে। প্রতিষ্ঠানটির তিন মাসব্যাপী করা একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, ফেরত আসা নারী কর্মীদের ৬১ শতাংশ নানা ধরনের শারীরিক নি’র্যাতনের শিকার এবং ১৪ শতাংশ যৌ’ন নি’র্যাতনের শিকার। এছাড়া ৫২ শতাংশ নারীকে জো’রপূর্বক দীর্ঘ সময় কাজে বাধ্য করা হয়। আর নি’র্যাতনের কারণে অ’সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন ৬৩ শতাংশ নারী। এছাড়া ৮৬ শতাংশ নারীকে ঠিকমত বেতন দেওয়া হয় না।
গবেষণা থেকে আরও জানা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অ’ভিবাসী আইন-২০১৩ অনুযায়ী কোনো অ’ভিবাসী যদি নি’র্যাতন ও প্রতারণার শিকার হন তবে মা’মলা করতে পারবেন। পাশাপাশি বিকল্প নিষ্পত্তির জন্য বিএমইটির কাছেও অ’ভিযোগ করতে পারবেন।
এ প্রসঙ্গে ওকাপ চেয়ারম্যান শাকিরুল ইস’লাম বলেন, ‘ফেরত আসা বেশিরভাগ নারীকে তাদের পরিবার গ্রহণ করতে চায় না। যদি পু’লিশের কাছে অ’ভিযোগ করেন, তবে তা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। সেক্ষেত্রে বিএমইটি শালিসের মাধ্যমে এসব অ’ভিযোগ নিষ্পত্তি করতে পারে। তবে সেখানেও রয়েছে নানান জটিলতা।’
বেসরকারি জনশক্তি রফতনিকারক আলী হায়দার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বৈধ উপায়ে যেসব নারী শ্রমিক বিদেশ যান তারা কম সমস্যায় পড়েন। যদি তারা সমস্যার সম্মুখীন হন তবে অ’ভিযোগ করলে উল্টো রিক্রুটিং এজেন্সির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেন। কিন্তু যারা ফেরত আসছেন তারা কোনো প্রমাণ দিতে পারছেন না। যে কারণে দায়ীদের বি’রুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না।’ তবে মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানোর পক্ষে তিনি নন।
এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় নারী কর্মীদের ফিরে আসার বিষয়টি মানতে নারাজ। সরকারি এ সংস্থাটির মতে, দালালদের মাধ্যমে যারা বিদেশ যাচ্ছেন, কেবল তারাই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।’
এ নিয়ে প্রশ্ন ছিল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইম’রান আহম’দের কাছে। তিনি বলেন, ‘সরকারের মাধ্যমে যেসব নারী শ্রমিক বিদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন, তারা ভালো’ভাবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। দালালদের মাধ্যমে যারা যাচ্ছেন তারাই সমস্যায় পড়ছেন।’ তবে যে বিপুল সংখ্যক নারী কর্মী দেশে ফিরছেন, সে বিষয়ে কি করা যায় তা ভাবা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠাতে সমঝোতা স্মা’রকে সই করে সরকার। সরকারি হিসেবে এরপর থেকে প্রায় তিন লাখ নারী কর্মী কাজের উদ্দেশে সৌদি আরব গেছেন।
