বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত ফরাজিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাটি সারাদেশেই আলোচিত সমালোচিত। এনিয়ে সবার মুখে মুখে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেউ বলছেন মিন্নির সঙ্গে খুনি নয়নের পুরনো সম্পর্ক নিয়ে, আবার জানা গেছে নয়ন রিফাতও একসময় ছিলেন বন্ধু। নয়নের সঙ্গে প্রেম ছিল মিন্নির, এজন্যেই এমন হত্যার শিকার হতে হয় রিফাতের এমন কথাও বলছেন অনেকে। কিন্তু আসলে কেমন ছিলেন মিন্নি! মানবকণ্ঠ জানার চেষ্টা করেছে সেই উত্তর।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনা প্রসঙ্গে নিহত রিফাতের এক ঘনিষ্ঠজন জানান, মিন্নির বাসা ছিল বরগুনা সদরে আর রিফাত শরীফ ইউনিয়ন পর্যায়ে বসবাস করতো। মিন্নি বরগুনা পুলিশ লাইন্স মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং বরগুনা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও সর্বশেষ ওই কলেজে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। বরগুনা সদরে কলেজে আসা-যাওয়ার পথেই রিফাত শরীফের সঙ্গে মিন্নির পরিচয় হয়। ওই পরিচয়ের সূত্র ধরে আড়াই বছর পূর্বে মিন্নি ও রিফাত শরীফের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
মিন্নি মিশুক স্বভাবের ও আড্ডা দেয়া তার পছন্দ ছিল। এছাড়া ছেলে-মেয়ে উভয়ের সাথেই মিন্নি হাসিখুশীভাবে কথা বলতো। এতে বেশিরভাগ ছেলে মনে করতো মিন্নি মনে হয় তার প্রেমে পড়েছে। কিন্তু না, মিন্নির স্বভাবটাই ছিল ওই রকম। মিন্নির সাথে যখন রিফাত শরীফের প্রেমের সম্পর্ক চলছিল তার বহু পূর্ব থেকেই নয়ন ও রিফাতের ঘনিষ্ঠতা ছিল। নয়ন ও রিফাত এক সঙ্গে ডিস ব্যবসা করতো।
তিনি আরো জানান, রিফাতের সাথে প্রেমের সম্পর্কের কারণে নয়নের সাথে মিন্নির পরিচয় হয়। মিন্নি তার ওই স্বভাবসুলভ আচরণ করে নয়নের সাথে। এতে নয়নও ভাবতে শুরু করে মিন্নি তার প্রেমে পড়েছে। এরপর নয়ন মিন্নিকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা শুরু করে। তাতেও মিন্নি রাজী না হওয়ায় তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। মিন্নি নয়নের ভয়ভীতি দেখানো এবং তাকে বিভিন্ন সময় হয়রানির বিষয়টি রিফাতকে জানায়। রিফাত এ নিয়ে বেশ কয়েকবার নয়নকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর রিফাতকে যারা ভালোবাসে ওই সকল বন্ধুরাও নয়নকে মিন্নির পথ থেকে সরে যেতে বলে। এতে সন্ত্রাসী নয়ন ক্ষুব্ধ হয়।
এ কারণে নয়নের সাথে রিফাতের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বিয়ের পূর্বে মিন্নিকে নিয়ে বেশ কয়েকবার নয়ন ও রিফাতের বাকবিতণ্ডা পর্যন্ত হয়েছে। বিয়ের পরও নয়ন প্রতিনিয়ত মিন্নিকে হয়রানি করতো। হয়রানি করার বিষয়টি মিন্নি একাধিকবার রিফাতকে জানিয়েছে। রিফাতও বিভিন্ন মাধ্যমে নয়নের হাত থেকে স্ত্রীকে রক্ষা করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। আর রিফাতের এ কর্মকাণ্ড ভালো লাগেনি সন্ত্রাসী নয়নের।
এ ব্যাপারে গতকাল বিকেল ৪টা ৬ মিনিটে মিন্নির সাথে মোবাইলে ৬মিনিট ৩৭ সেকেন্ড এ প্রতিবেদকের কথা হয়। মিন্নি তার ঘনিষ্ঠজনদের দেয়া তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে নয়নের হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরেন। মিন্নির সাব জবাব আমি একমাত্র রিফাত শরীফকেই ভালোবাসতাম। এছাড়া আমার সাথে আর কারোর কোনো সম্পর্ক ছিল না। নয়নের সঙ্গে বিয়ের কাবিন প্রসঙ্গে মিন্নি বলেন, এ তথ্য সত্য নয়। নয়ন পিস্তলের মুখে আমাকে একটি বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করেছিল। সেই থেকে নয়ন আমাকে তার স্ত্রী দাবি করতো। বরিশালের পুলিশ ও র্যাব সূত্র জানায়, আসামিদের ধরতে বরিশাল বিভাগের সবকটি জেলা ও উপজেলায় গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব অভিযান চালাচ্ছে। দূরপাল্লার বাস, লঞ্চগুলোতেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ঢাকার কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একাধিক টিমও আসামি গ্রেফতারে অংশ নিচ্ছে।
জানতে চাইলে পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, রিফাত হত্যায় জড়িত আসামিদের গ্রেফতারে শুধু বরিশাল বিভাগ নয়, সারা দেশে তৎপরতা চলছে। তারা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দুই-একদিনের মধ্যেই বেশ কয়েকজন আসামি ধরা পড়তে পারে।
প্রসঙ্গত, বুধবার সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের সড়কে প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নির সামনে স্বামী রিফাত শরীফকে (২৫) সিনেমাটিক কায়দায় কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই হত্যাকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হলে সমালোচনার ঝড় উঠে। রিফাত হত্যাকারীরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য পরের দিনই পুলিশ প্রধানকে (আইজিপি) নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগ। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতারে অগ্রগতি দ্রæত জানাতেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
মানবকণ্ঠ
