সাইফউদ্দিন বোলিং-ব্যাটিংয়ে এলে টিভি ছেড়ে উঠে যায় তার মা

প্রত্যেক মা নিজের সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। সন্তানের প্রতিটি কাজে মায়ের অনুপ্রেরণা, সাহস, মায়া, ভালোবাসা, দিকনির্দেশনা ও দোয়া থাকে।

সাইফউদ্দিনের সম্পর্কে সেসব গল্প শুনতে হাজির হয়েছিলেন সাইফের ফেনীর বাসায় হাজির হয়েছিলেন নিউজরুম এডিটর মুহাম্মাদ মিনহাজ উদ্দিন ও স্টাফ করেসপন্ডেন্ট সোলায়মান হাজারী ডালিম।

মায়ের বক্তব্যেই শোনা যাক আজকের মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের এতদূর আসার সাত-সতেরো-

ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ছিল অদম্য‘ছোটবেলা থেকেই খেলার প্রতি সাইফউদ্দিনের প্রবল আগ্রহ-উদ্দীপনা ছিল। ‘মুসলমানি’ করালে সাধরণত শিশুরা খেলাধুলা তেমন করতে পারে না। কিন্তু সাউফউদ্দিন ছিলো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ওকে ব্যাট-বল এনে দেওয়ার পর বাসাতেই ওই অবস্থায় সে খেলতে শুরু করে।

শৈশবে অধিকাংশ সময় এমন হয়েছে যে, সন্ধ্যা নেমে এসেছে। কিন্তু সাইফউদ্দিন খেলার মাঠ থেকে বাসায় ফেরেনি। তখন দেখা যেত নামাজ হয়তো একটু পরে পড়তে হতো। যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করে তখন ফিরেই বলতো, ‘আম্মু ভাইয়াকে বলেন আমার সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে।’ ভাই বলতো, এখন তো স্যার আসবে। ভাইয়া সামান্য সময় একটু বিশ্রাম নেই। স্যার চলে যাওয়ার পর খেলবো। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সাইফউদ্দিন তো দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তাকে খেলতেই হবে। তাই অনেক সময় দেখা গেছে, বড় ভাই বের হয়নি কিন্তু সাইফ ব্যাট-বল নিয়ে বেরিয়ে গেছে। এদিকে স্যার এসে তার জন্য অপেক্ষামান। কিন্তু সাইফ তখন খেলার মাঠে। তখন আবার তাকে খুঁজে ডেকে নিয়ে আসতে হতো।

বড় পর্যায়ে খেলার লালিত স্বপ্নখেলার প্রতি তার আগ্রহ কেমন ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার এতো আগ্রহ ও ভালোবাসা দেখে তাকে বলতাম, আমাদের এদিক থেকে তো কাউকে বড় পর্যায়ে খেলতে দেখিনি। তুই কি পারবি? তখন সাইফ অকপটে বলতো, হ্যাঁ আম্মু পারবো ইনশাআল্লাহ।

ক্লাস সেভেনে ওঠার পর তাকে পেয়ে বসে আরেক ভাবনা। শুধু বলতে থাকে, ‘আম্মু এবার ফেনী শহরে চলেন। ওখানে বাসা নিয়ে থাকবো। গ্রামে হলে ভালো করে খেলতে পারবো না।’

নতুন পথে চলতে শুরুফেনী আসার পর কোন ক্লাবে ভর্তি হবে এ নিয়ে তার মনে বিভিন্ন রকমের জেদ দেখা যায়। আমাকে বলতে শুরু করে আম্মু আমাকে অমুক ক্লাবে ভর্তি করান। কিন্তু আমি তো কোনো ক্লাব তখন চিনি না। এরপর দেখলাম সে ফ্রেন্ডশিপ ক্লাবে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু কীভাবে যে ভর্তি হয়েছে, আমি নিজেও জানি না। আমাকে একদিন বলে, আম্মু এক শ টাকা দিন, ফ্রেন্ডশিপ ক্লাবে ভর্তি হবো।

তার চাওয়ার ভিত্তিতে তাকে এরপর ভর্তি করানো হয় শাহিন একাডেমিতে। তখন স্কুল থেকে এসে তড়িঘড়ি করে আবার ছুটতো ক্লাবে।

সন্ধ্যা হয়ে গেলেও সে পড়ে থাকতো খেলার মাঠে। মাগরিবের পর বাসায় না আসলে তো আমার আর শান্তি লাগতো না। তাই বারবার খোঁজ করতাম। ডেকে নিয়ে আসতাম।

অপু-কামরুল ও স্বপন​দের (কৈশোরের কোচ) সঙ্গে পরিচয়যেখানে ফ্রেন্ডশিপ ক্লাবে খেলতে খেলতে অপুদের (শরিফুল ইসলাম অপু, কামরুল ইসলাম ও স্বপন) সঙ্গে পরিচয়। আমি মনে করি, ফেনীতে আমি ছাড়াও তার অনেকজন অভিভাবক হয়ে ওঠে।

প্রাথমিক পর্যায়ে জেলাভিত্তিক দলগুলোতে খেলে সাইফ। ২০০৮ সালে ওর বাবা মারা যাওয়ার পর আমার বড় ভাই গাইড করতেন। মোটামুটি খোঁজখবর রাখতেন। কখন কী অবস্থা তা জানতে চাইতেন। সর্বোপরি আল্লাহর রহমত, নিজের চেষ্টায় সাইফ প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। তবে পেছন থেকে অপু, কামরুল ও স্বপনরা যথেষ্ট দিক-নির্দেশনা ও পরামর্শ দিতো।

ছেলেকে আর বাধা দেইনিযখন দেখলাম সে পারবে, তার দ্বারা কিছু হওয়া সম্ভব—তখন আর বাধা দিইনি। তখন আমরা বলাবলি করতাম, ওর যেহেতু আগ্রহ প্রচুর সে চেষ্টা করে দেখুক—কতদূর যাওয়া যায়।

ছেলের জন্য মায়ের চেষ্টারাতে ঘুমানোর সময় বলতো, আম্মু আপনি যখন ফজরের সময় ওঠবেন আমাকে জাগিয়ে দেবেন। তাই প্রতিদিন সাত-সকালে জাগিয়ে দিতাম। নাস্তা আর দানাপানি দিয়ে ‘আল্লাহর হাওয়ালা’ করে বিদায় দিতাম। তখন বাসা থেকে বের হয়ে হয়তো ও কলেজ মাঠে অথবা স্টেডিয়ামে চলে যেতো।

ঝগড়া করে খেলা দেখা, খেলা দেখে স্বপ্ন পোষাবাসায় বসে টিভিতে খেলা দেখা তার ভীষণ শখের ছিল। বোনদের সঙ্গে এজন্য রীতিমতো ঝগড়া হতো। সবাই বলতো নাটক দেখবো, কিন্তু সে খেলা দেখতে অনড়। খেলার সময় অন্যকিছু দেখতে কোনোভাবেই রাজি নয়। তার এমন অদম্য অভ্যাস দেখে বলতাম, ‘তুই যে এতো খেলা দেখিস, এদের মতো হতে তুই পারবি?’ সে বিশ্বাস নিয়ে বলতো, ‘পারবো ইনশাআল্লাহ। পারবো না কেন?’

জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণজাতীয় দলে প্রথম সুযোগ পাওয়ার সুখবর সর্বপ্রথম ফোন করে সে আমাকে জানিয়েছে। তখন অ-নে-ক খুশি লেগেছে। এর আগে অনেকে বিভিন্ন রকমের মন্তব্য করতো। কেউ কেউ বলতো যতই চেষ্টা করুক, লোক ছাড়া জাতীয় দলে খেলা সম্ভব নয়। এ কথা আত্মীয়-স্বজনদের অনেকেও বলতো। কিন্তু আল্লাহর অসীম রহমতে সে নিজের চেষ্টায় এগিয়ে গেছে এবং জাতীয় দলে নিজেকে অপরিহার্য প্রমাণ করেছে।

মা দেখতে পারেন না ছেলের খেলা!বাংলাদেশের খেলা দেখতে বসি, কিন্তু সাইফউদ্দিন বোলিংয়ে বা ব্যাটিংয়ে এলে আমি চলে যাই। ওর খেলা দেখতে পারি না। কারণ, ভালো করবে নাকি খারাপ করবে—এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি। ভালো খেললে তো কোনো কথা নেই। সবার মতো নিজের কাছে ভালো লাগে। কিন্তু যদি খারাপ করে! তাহলে তো কষ্ট লাগে। এ আশঙ্কায় ওর ব্যাটিং-বোলিং আমি দেখি না। ছেলে-মেয়েদের পরে জিজ্ঞেস করি, ও কী করলো?

বিদেশ থেকে মায়ের সঙ্গে কথোপকথনবিভিন্ন দেশে যখন ও খেলতে যায়, প্রায় প্রতিদিন ফোন করে। আমরাও বাসা থেকে ফোন দেই। অনেক সময় আমার খারাপ লাগলে বা কথা বলতে ইচ্ছে হলে আমি নিজেই ফোন দিই। এই বছর ঈদে বাসায় ছিল না। প্রতি ঈদে তিন ভাই মিলে ঈদের নামাজ আদায় করতে যায়। একসঙ্গে ঘোরাফিরা, খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দ করে। বিকেলে বাড়িতে গিয়ে বাবার কবর জিয়ারত করে আসে। আমি কামনা করি, সাইফউদ্দিন সবসময় ভালো করুক। বাকি সবকিছু তো আল্লাহর হাতে।

মায়ের জন্য বিদেশ-বিভূঁইয়ে কেনাকাটাবিদেশে গেলে বিভিন্ন কিছু আমার জন্য কিনে নিয়ে আসে। আবার ফোন করে জিজ্ঞেস করে, আম্মু কী নিয়ে আসবো? কিন্তু আমি তেমন কিছু বলি না। বিদেশি জিনিসের প্রতি আমার এতো আগ্রহ নেই। মেয়ের জামাতা বিদেশে থাকেন, সে বিভিন্ন কিছু নিয়ে আসে প্রতি বছর। ঘরের সবার জন্য নিয়ে আসে সে। তবু সত্য কথা বলতে কি বিদেশি জিনিসের প্রতি আমার অতো আগ্রহ নেই। এরপরও সে জিজ্ঞেস করে, কী নিয়ে আসবো? কী কিনবো? ইত্যাদি।

মা তুমি বাবা তুমিএখনো প্রত্যেক বিষয় আমার সঙ্গে শেয়ার করে। এ বছর যে পরিমাণ জাকাত এসেছে, যাওয়ার আগে সবগুলো বণ্টনের দায়িত্ব আমাকে দিয়ে গেছে। সবকিছুতে আমাকে স্মরণ করে। না জানিয়ে কিছু করে না।

ইস্পাত-কঠিন মানসিকতায় দৃঢ়চেতা সাইফসাইফ ভদ্র-সুবোধ। তবে অসম্ভব জেদিও বটে। অপরিণত বয়স থেকেই তার বেশ জেদ ছিল। যেটা করবে বলতো, সেটা করেই ছাড়তো। যেটা কিনে দিতে বলতো, তা কিনে দিতেই হতো। তার কথার ওপর কেউ কথা বলতে পারতো না। ছোটবেলায় কখনো বাজারে গেলে, সে বলতো আমাকে এটা কিনে দিতে হবে। সে যেটা কিনে দিতে হবে বলতো, সেটা দিতে হতোই। ওর আব্বু সরকারি কাজে বাইরে যাওয়ার সময় বলে যেত, ‘দেখবা সাইফ একদিন অনেক কিছু হতে পারবে, তার প্রচণ্ড জিদ।’

ভবিষ্যতে তুমি কী হতে পারবে?আমার বড় ছেলে একদম শান্ত-সৌম্য। লেখাপড়ায় ভালো ছিল। তাই বড় ছেলেকে নিয়ে বেশি স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু সাইফউদ্দিন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত—জেদি ও মেজাজি। যা বলে তা করেই ছাড়ে। কিন্তু সময়ের পালাক্রমে মন-মানসিকতায় এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে।

মাঝে মাঝে আমি সাইফকে বলতাম, এতো জিদ নিয়ে তুমি ভবিষ্যতে কী করবে? কী হতে পারবে? সে বিশ্বাস নিয়ে বলতো, ‘আপনি দেখবেন আমি অনেক কিছু করবো।’

জাতীয় দলের সবাই নিজের সন্তানের মতোবাংলাদেশ টিমের প্রত্যেক সদস্য সাইফউদ্দিনের মায়ের কাছে নিজের সন্তানের মতো। তাই সাইফউদ্দিনের জন্য যেমন দোয়া করেন, তেমনি অন্যদের জন্যও দোয়া করতে ভোলেন না। তাই মায়ের দরদ ও ভালোবাসা-উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন, ‘পুরো বাংলাদেশ টিমের জন্য দোয়া। প্রত্যেকের জন্য দোয়া, সবাই যেন ভালো খেলে। তারা ভালো খেললে তো আমাদের ভালো লাগে। সবার জন্য দোয়া কামনা করি, সামনের প্রতিটি ম্যাচ যেন তারা ভালো খেলে। বাংলাদেশ টিমের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই।’

সুত্র: বাংলানিউজ২৪।