বাণিজ্যিকভাবে খামারে কুমির চাষের ধারণাটি বাংলাদেশে একদম নতুন বললেই চলে।
১৫ বছর আগে ময়মনসিংহের ভালুকায় দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমির খামার যাত্রা করে।
এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরো কয়েকটি খামার গড়ে উঠেছে। শুধু গড়ে ওঠায় সীমাবদ্ধ নেই এসব খামার।
বরং সফলতার সঙ্গে পরিচালনার মাধ্যমে দেশেই কুমিরের জন্ম দিয়ে সরীসৃপটির চামড়া রফতানিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। তাই বলা হচ্ছে, দেশের রফতানি পণ্যের তালিকায় নতুন সম্ভাবনার নাম কুমির ও এর চামড়া।
সরকারের অনুমতি নিয়ে এবং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে ২০০৪ সালের ২২ ডিসেম্বর দেশের প্রথম বাণিজ্যিক কুমির খামার হিসেবে যাত্রা করে রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা সদর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে হাতিবেড় গ্রামে ১৩ একর জমিতে খামারটি গড়ে তোলা হয়। শুরুতে মালয়েশিয়া থেকে এ খামারে ৭৪টি কুমির আমদানি করা হয়েছিল। ওই সময় দেশে কুমির চাষের ভবিষ্যৎ নিয়ে নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে খামারিদের মনে সংশয় ছিল। ২০০৬ সালে এসে এ সংশয় কাটতে শুরু করে। ওই বছর প্রথমবারের মতো দুটি কুমির ৬৯টি ডিম দেয়। আশা জাগে খামারিদের মনে।
তবে ৬৯টি ডিম ফুটে মাত্র তিনটি ছানার জন্ম হয়। ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে তিনটি ছানা মারা যায়। নতুন করে হতাশা নেমে আসে। তবে এর পরের বছর ৬০০ ডিম থেকে জন্ম নেয় ১৪১ কুমির ছানা। বর্তমানে খামারটিতে তিন হাজারের বেশি বিভিন্ন বয়সী কুমির আছে। বাংলাদেশে কুমিরের দ্বিতীয় বাণিজ্যিক খামার যাত্রা করে ২০০৯ সালে, বান্দরবানে। আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ লিমিটেড শুরুতে ৫০টি কুমির নিয়ে যাত্রা করে। বর্তমানে খামারটিতে দুই হাজারের বেশি কুমির রয়েছে।
কুমির চাষ অর্থনৈতিকভাবে খুবই লাভজনক একটি উদ্যোগ। এটাই পুরোপুরি রফতানিনির্ভর। খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, কুমিরের কোনো কিছুই ফেলনা নয়। জীবিত কুমির রফতানি করার সুযোগ রয়েছে। দেশের বাইরে কুমিরের চামড়া, মাংস, দাঁত ও হাড়ের চাহিদা প্রচুর। তবে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয় কুমিরের চামড়া। ২৪টি প্রজাতির মধ্যে লোনা পানির কুমিরের চামড়ার দাম সবচেয়ে বেশি। সাধারণ চামড়া দিয়ে যেসব পণ্য তৈরি হয়, কুমিরের চামড়া দিয়েও একই পণ্য তৈরি হয়। তবে এসব পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি।
সাধারণত কুমিরের পেটের চামড়া সবচেয়ে মূল্যবান। লোনা পানির কুমিরের ভালো মানের একটি চামড়া ন্যূনতম ১ হাজার ডলারে বিক্রি হতে পারে। কুমিরের মাংস, দাঁত, হাড়সহ অন্যান্য উপকরণ বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব। লোনা পানির কুমিরের পেটের চামড়া একেবারে মোলায়েম। তবে কুমিরের বয়স পাঁচ বছরের বেশি হলে চামড়ার নিচে মাছের আঁশের মতো শক্ত একটি আবরণ তৈরি হয়। এতে চামড়া শক্ত হয়ে যায়।
দাম কমতে শুরু করে। এ কারণে বাণিজ্যিক খামারগুলোয় পাঁচ বছরের কম বয়সী কুমিরের চামড়া সংগ্রহ করা হয়। তিন বছর বয়সী একটি কুমির থেকে গড়ে এক বর্গফুট চামড়া সংগ্রহ করা যায়।
কুমিরের ঘাড় থেকে লেজ অবধি লম্বালম্বি কাটা চামড়া থেকে বেল্ট তৈরি হয়। শরীরের অন্যান্য অংশের চামড়া দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান স্যুভেনির। কুমিরের দাঁড়া দিয়ে তৈরি হয় অলংকার। মূলত ইউরোপ-আমেরিকায় কুমিরের চামড়া ও দাঁত সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এছাড়া পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কুমিরের মাংস আমদানি করে।
রফতানিযোগ্য কুমিরের চামড়া উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হয় মান নিয়ন্ত্রণে। ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় ক্রেতা সামান্য দাগ কিংবা আঁচড়যুক্ত চামড়া বাতিল করে দেন। সেক্ষেত্রে পণ্যটির দাম ৩০-৪০ শতাংশ কমে যায়। এ কারণে চামড়া সংগ্রহের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আধুনিক প্রযুক্তি বা কৌশল প্রয়োগ করা জরুরি।
বাণিজ্যিকভাবে কুমির চাষের জন্য অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটরির খ্যাতি বিশ্বজোড়া। এ অঞ্চল থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ডলারের কুমিরের মাংস ও চামড়া রফতানি হয়। চীন, জাপান, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বছরে ৭০-৭৫ হাজার ডলারের কুমিরের মাংসের বাজার রয়েছে। কুমির ও কুমিরের চামড়া রফতানি বাজারে অস্ট্রেলিয়া ও পাপুয়া নিউগিনি আধিপত্য ধরে রেখেছে।
সময় ২০১০ সাল। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কুমির রফতানিকারক দেশগুলোর তালিকায় নাম লেখায়। ওই বছর জার্মানিতে হিমায়িত অবস্থায় ৬৭টি কুমির রফতানি করা হয়। আয় হয় ৭০ লাখ টাকা। ২০১৪ সাল থেকে নিয়মিত জাপানে কুমিরের চামড়া রফতানি করছে রেপটাইলস ফার্ম। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৪৩০টি চামড়া রফতানি হয়েছিল। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে তা দাঁড়ায় ৪০০ ও ২০০টিতে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২২৬টি চামড়া রফতানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কুমিরের খামার করতে শুরুতে প্রাপ্তবয়স্ক কুমির প্রয়োজন হয়। একে বলা হয় ব্রিডিং স্টক। একটি কুমির সাধারণত শতবছর বাঁচে। ডিম দেয়া শুরু করে ৮-১০ বছর বয়স থেকে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক কুমির আয়ুষ্কালে প্রায় ২ হাজার ৫০০ ডিম দেয়। তবে চামড়া সংগ্রহ করা হয় তিন-পাঁচ বছর বয়সী কুমিরের। এ কারণে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী কুমির ধীরে ধীরে ব্রিডিং স্টকে পরিণত হয়।
দেশে যখন প্রথম খামার করা হয়, তখন মালয়েশিয়া থেকে ব্রিডিং স্টক আনা হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ জটিলতার জের ধরে কুমিরের চামড়া রফতানি শুরু করতে বেশ দেরি হয়েছিল। এর মধ্যেই অনেক কুমির ব্রিডিং স্টকে পরিণত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য উপকার বয়ে এনেছে। ফলে দেশীয় কোনো উদ্যোক্তা নতুন খামার গড়তে গেলে আর ব্রিডিং স্টক আমদানি করতে হবে না। নিজস্ব কুমির দিয়েই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। তাই বলা যায়, ব্রিডিং স্টকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন স্বাবলম্বী।
দেশের খামারগুলোয় জন্ম নেয়া কুমির ২০১৬ সাল থেকে প্রজনন শুরু করেছে। বর্তমানে রেপটাইলস ফার্ম ও আকিজ ওয়াইল্ড লাইফের সংগ্রহে যেসব কুমির আছে, তা দিয়ে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বছরে ১০ হাজার চামড়া রফতানি করতে সক্ষম হবে। এটা আমাদের রফতানিমুখী শিল্প বিকাশে একটি বড় সম্ভাবনা। বাংলাদেশের আবহাওয়া লোনা পানির কুমির প্রজনন ও লালন-পালনের জন্য খুবই কার্যকর। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বন বিভাগের অনুমতিসাপেক্ষে ও আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে দেশে কুমিরের ছোট আকারের বাণিজ্যিক খামার গড়ে তোলা সম্ভব।
শুরুর দিকে রেপটাইলস ফার্ম দুজন কর্মীকে ভারতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের জন্য পাঠিয়েছিল। বর্তমানে দেশের কুমির খামারগুলোয় দক্ষ জনবল রয়েছে। তাদের সবারই কুমির লালন-পালনের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। খামারগুলো প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেই কুমির চাষ করে, চামড়া সংগ্রহ করে। কুমির প্রজননেও ব্যবহার করা হয় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। ১৫ বছরে এদিকটায় আমরা অনেকটাই এগিয়ে গেছি।
এখন প্রয়োজন চামড়া উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন, মান নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়া। একই সঙ্গে রফতানি বাজারে দেশীয় কুমিরের চামড়ার ব্র্যান্ডিং বাড়ানো। এখন পর্যন্ত কাঁচা চামড়া রফতানির দিকেই আমাদের সমস্ত মনোযোগ। সময় এসেছে কাঁচা চামড়ার পাশাপাশি কুমিরের চামড়াজাত বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে তা রফতানির।
দেশের পর্যটন খাতের বিকাশে কুমিরের খামার ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষের মধ্যে কুমির ও এর খামার নিয়ে আগ্রহ আছে। বিশ্বের যেসব অঞ্চলে কুমিরের খামার আছে, সেসব অঞ্চলে চামড়া বিক্রি বাবদ যা আয় হয়, সমপরিমাণ আয় হয় কুমিরের খামারকেন্দ্রিক পর্যটন থেকে। এজন্য প্রয়োজন আলাদা অবকাঠামো নির্মাণ। পরিকল্পনা অনুযায়ী উদ্যোগ নেয়া।
বাণিজ্যিকভাবে কুমির চাষের ক্ষেত্রে আমরা ‘অস্ট্রেলিয়া মডেল’ মেনে চলতে পারি। দেশটিতে যখন লোনা পানির কুমিরের সংখ্যা পাঁচ হাজারের নিচে নেমে এসেছিল, তখন অস্ট্রেলিয়া সরকার কুমির শিকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এর জের ধরে বর্তমানে দেশটিতে কুমিরের সংখ্যা লাখের উপরে উঠেছে। অস্ট্রেলীয় খামারিরা প্রকৃতি থেকে লোনা পানির কুমিরের ডিম সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে খামারে তা লালন-পালন করেন।
প্রতিটি ডিমের জন্য আলাদা করে কর দিতে হয়। এতে একেকটি ডিমের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে আমরা যেহেতু ব্রিডিং স্টকে স্বাবলম্বী হয়েছি, তাই আমাদের খামারগুলোয় স্বল্প খরচে ডিম উৎপাদনের সক্ষমতা এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। এটা বাড়তি আয়ের বড় একটি সুযোগ।
দেশে দীর্ঘমেয়াদে কুমির সংরক্ষণের পরিকল্পনা করলে সুন্দরবনে কুমিরের সংখ্যা ২০০ থেকে বাড়ানো সম্ভব হবে। তখন আমাদের দেশীয় খামারিরাও প্রকৃতি কিংবা বন বিভাগের কাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করতে পারবেন। করমজলের কুমির প্রজনন কেন্দ্র এ লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে। কুমির লালন-পালন বিধিমালা গেজেট আকারে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এ নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে হবে।
লেদার ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড টেকনোলজিস্ট’স সোসাইটি অব বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট আফজাল হোসেন জানান, দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কুমির চাষ ও চামড়া সংগ্রহের সব ধরনের আধুনিক সুবিধা রয়েছে। আমাদের কর্মীরাও বেশ দক্ষ।
তাই দেশে সহজেই কুমিরকেন্দ্রিক একটি শিল্প গড়ে উঠতে পারে। তবে এক্ষেত্রে সমন্বয় সাধন ও নীতিমালা সংশোধন করা জরুরি। দেশে চামড়া শিল্প আগে থেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত। এর সঙ্গে কুমিরের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য যুক্ত করলে সামগ্রিক শিল্প নতুন মাত্রা পাবে। বাণিজ্যিকভাবে কুমির চাষের সম্ভাবনার পথে আমরা অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছি। সময় এখন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর।
সূত্র : বণিক বার্তা ,লেখক: কুমিরচাষী
