৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদের ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলে। এরপর শুরু হয় গণনা। সন্ধ্যার পর থেকেই টুকটাক ফলাফল আসতে শুরু করে। আগের অভিজ্ঞতায় রাতভর ফলাফল সংগ্রহের প্রস্তুতি ছিলো। কিন্তু মধ্যরাতেই ফলাফলের চিত্র পরিষ্কার হয়ে যায়। একটি দক্ষ বাহিনী নিয়ে এটিএন নিউজে ফলাফল সংগ্রহ কাজ সমন্বয় করি আমি।
রাত দুইটা নাগাদ সারাদেশের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে ২৯৮ আসনের বেসরকারি ফলাফল হাতে চলে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ফলাফল স্থগিত থাকায় ৩০ ডিসেম্বর রাতে সর্বোচ্চ ২৯৮টি আসনেই ফলাফল পাওয়া সম্ভব ছিলো। একাধিকবার ক্রসচেক করে রাত দুইটায় আমরা এটিএন নিউজের স্ক্রলে ২৯৮ আসনের দলভিত্তিক হিসাব দিয়ে দিই। আমাদের পাওয়া হিসাব ছিলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়েছে ২৮৮ আসন।
বিএনপিনির্ভর ঐক্যফ্রন্ট জিতেছে ৭ আসনে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন ৩ আসনে। জোটভিত্তিক হিসাবটা ছিল এমন- আওয়ামী লীগ এককভাবে পেয়েছে ২৫৫ আসন। মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি ২২, জাতীয় পার্টি-জেপি ১, ওয়ার্কার্স পার্টি ৩, জাসদ (ইনু) ২, বাংলাদেশ জাসদ ১, ত্বরিকত ফেডারেশন ২ এবং বিকল্পধারা ২। আর বিরোধী জোট ঐক্যফ্রন্টের হিসাব ছিলো সহজ বিএনপি ৫, গণফোরাম ২।
রাত তিনটার নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দিন সর্বশেষ ব্রিফিং শুরু করেন তিনটার পর। অধিকাংশ টিভি চ্যানেল সে ব্রিফিং সরাসরি সম্প্রচার করছিলো। সচিব কিছুক্ষণ কথা বলে সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে জানান, এখন তিনি ২৯৮ আসনের চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করবেন। আমরা কাগজ-কলম নিয়ে তৈরি। তখন লাইভে গোটা জাতিকে সামনে রেখে তারা মঞ্চেই তারা হিসাব মেলাতে বসলেন। মিনিট চল্লিশেক সবাইকে বসিয়ে সচিব যে হিসাব দিলেন তা শুনে তো আমার মাথায় বাড়ি।
তার সাথে আমার হিসাব মিলছিলো না। তাহলে আমরা এতোক্ষণ কী করলাম? নির্বাচন কমিশনের হিসেবে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২৫৯, জাতীয় পার্টি ২০, ত্বরিকত ১। বাকিগুলো ঠিকই ছিলো। তবে নির্বাচন কমিশনের তালিকায় জেপি এবং বাংলাদেশ জাসদের নামই ছিলো না। নিবন্ধিত নয় বলে বাংলাদেশ জাসদকে আলাদা করে না দেখিয়ে আওয়ামী লীগের একাউন্টে ঢুকিয়ে দেয়া ঠিকই আছে।
কিন্তু জেপি তো নিবন্ধিত দল। আর দলের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জিতেছেন পিরোজপুর-২ আসন থেকে। তিনি গেলেন কই? ত্বরিকত ফেডারেশন সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী জিতেছেন চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে, আর আনোয়ার হোসেন খান জিতেছেন লক্ষীপুর-১ আসন থেকে। তাহলে নির্বাচন কমিশন যে বলছে, ত্বরিকত ফেডারেশন ১টি আসন পেয়েছে, তাহলে আরেকটি আসন কই গেলো?
লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে জেতা জাতীয় পার্টির ২২ জনের নামের তালিকাও আমাদের হাতে ছিলো। ২২ জনের মধ্যে ২১ জন মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছিলেন, আর একজন জিতেছেন জাতীয় পার্টির নিজস্ব মনোনয়নে উন্মুক্ত আসনে। এরপর মাথায় ডাবল বাড়ি পড়লো, যখন সচিব জানালেন, বিএনপি জিতেছে ৬টি আসনে।
আমাদের হিসাব অনুযায়ী বিএনপি ঠাকুরগাঁও-৩, বগুড়া-৪ ও ৬ এবং চাপাইনবাবগঞ্জ-২ ও ৩ আসনে জয় পেয়েছে। এখন বিএনপিকে আরেকটি আসন আমরা কোত্থেকে জোগাড় করে দেবো? তবে কোত্থেকে জোগাড় করবো তা ভাবতে ভাবতে সচিব সমাধান করে দেন। চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সংশোধনী দিলেন।
তাতে বিএনপির সমস্যা মিটলো, বিএনপি পেয়েছে ৫টিই। জেপির নামও উল্লেখ করলেন। তবে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, ত্বরিকত ফেডারেশন আর বাংলাদেশ জাসদের হিসাবের গড়মিলটা রয়েই গেলো। আগেই বলেছি নিবন্ধন না থাকায় বাংলাদেশ জাসদকে আওয়ামী লীগের খাতায় গোনা যায়। তাতে আমাদের হিসেবে আওয়ামী লীগের ২৫৫ আসনের সাথে ১ যোগ করে ২৫৬ বলা যেতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বলছে, আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২৫৯ আসন। বাড়তি তিনটি আসন তারা ম্যানেজ করেছে জাতীয় পার্টি থেকে দুটি আর ত্বরিকত ফেডারেশন থেকে একটি কমিয়ে।
আমরা নির্বাচন কমিশনের সাথে একমত হওয়ার চেষ্টা করেছি। সহকর্মী সারোয়ার হোসেনকে নিয়ে পুরো তালিকা নিয়ে আবার বসি। একটি একটি করে মিলিয়ে আমরা জাতীয় পার্টির ২২ এবং ত্বরিকত ফেডারেশনের দুটি আসনপ্রাপ্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হই। তাই আত্মবিশ্বাসের সাথে আমাদের হিসাবটাই আমরা সম্প্রচার করি।
আমি সচিবের সংবাদ সম্মেলনে থাকলে বিষয়টি পরিষ্কার করে নিতে পারতাম। আমি নিশ্চিত, প্রথমবার যেমন বিএনপিকে ৬টি দিয়ে আবার সংশোধন করে ৫টিতে নেমেছেন, জেপিকে উধাও করে দিয়ে আবার আসন দিয়েছেন; তেমনি আবার তারা সংশোধন জাতীয় পার্টি ও ত্বরিকত ফেডারেশনকে তাদের আসন ফিরিয়ে দেবেন।
এটিএন নিউজের ছোট্ট টিম যে তালিকাটি প্রায় নিখুঁতভাবে করে ফেলতে পারলো, নির্বাচন কমিশন এতো আয়োজন করেও তা পারলো না কেন? বারবার কেন সংশোধন করতে হলো?
লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ
