হামলা গুলি প্রাণহানিতে উত্তপ্ত ভোটের মাঠ

নতুন করে হামলা-পাল্টাহামলায় উত্তপ্ত ভোটের মাঠে। খাগড়াছড়িতে গুলিতে নিহত হয়েছে দুজন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়ে শরীয়তপুরে বিএনপির এক প্রার্থী ভর্তি হয়েছেন ঢাকার হাসপাতালে। বরিশালের একটি আসনে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের গুলি করেছেন বিএনপির প্রার্থী।

হামলা হয়েছে বিএনপির অন্তত সাতজন প্রার্থীর বহরে। বিভিন্ন এলাকায় সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে উভয় দলের কার্যালয়। আহতের সংখ্যা সব মিলিয়ে শতাধিক। বেশ কয়েকজনকে আটকও করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিএনপির নেতা মওদুদ আহমেদ সরে দাঁড়ানোর হুমকি দিয়েছেন।
আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোটকে সামনে রেখে আগের রাতে দেশের ৪০৯টি উপজেলায় মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী। আর আগের কয়েক দিনের তুলনায় গতকাল বিএনপির দৃশ্যমান প্রচার ছিল বেশি।

পানছড়িতে গুলিতে নিহত দুই

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় পুজগাঙে ব্রাশফায়ারে দুজন নিহত হয়েছেন। আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী নতুন কুমার চাকমার নির্বাচনী অফিস।
ঘটনায় সংস্কারবাদী হিসেবে পরিচিত জেএসএস (এম এন লারমা) গ্রুপকে দায়ী করেছে ইউপিডিএফ। তবে জেএসএস (এম এন লারমা) অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন পুজগাঙের লেন্দিয়া পাড়ায় উজ্জ্বল চাকমা ও চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকার বাসিন্দা নির্মাণশ্রমিক সোহেল রানা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর ১২টার দিকে ১০-১২ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী পুজগাঙ বাজার এলাকায় গিয়ে এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার করতে থাকে। এ সময় ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন। পরে হামলাকারীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী নতুন কুমার চাকমার নির্বাচনী অফিসে আগুন দেয়।

ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ির সমন্বয়ক উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমার অভিযোগ, ‘আওয়ামী লীগের প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার মদদে সংস্কারবাদী জেএসএসের সন্ত্রাসীরা এই হামলা চালিয়েছে।’
তবে জেএসএস (এম এন লারমা) দলের সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক প্রশান্ত চাকমা বলেন, ‘ওই এলাকাটি ইউপিডিএফ-অধ্যুষিত। তাদের কোন্দলের কারণে এই ঘটনা ঘটেছে।’
পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল আলম বলেন, ‘এটি আঞ্চলিক দলের কোন্দলের কারণে হয়েছে।’

বিএনপির প্রার্থী রক্তাক্ত

শরীয়তপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন অপু আক্রান্ত হয়েছেন। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার মাথা ফেটে গেছে। বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের প্রায় ৩০ নেতাকর্মী আহত হন। রক্তাক্ত অপুকে হেলিকপ্টারে করে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে আনা হয়।
শরীয়তপুর জেলা মহিলা দলের সম্পাদক আসমা উল হুসনা জানান, নুরুদ্দিন অপু কোদালপুরের বাড়ি থেকে নেতাকর্মীদের নিয়ে মিছিল করে গোসাইরহাট উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা ভবনের সামনে পৌঁছালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়।
গোসাইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেলিম রেজা বলেন, ‘বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মুখোমুখি মিছিলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।’

অন্তত পাঁচ প্রার্থী আক্রান্ত

লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর প্রচারে হামলা হয় সদর উপজেলার শান্তিরহাট বাজারে। এতে এ্যানী ছাড়াও প্রায় ৩০ জন নেতা-কর্মী আহত হন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে পুলিশ।

এ্যানীর অভিযোগ, শান্তিরহাট বাজারে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল আমিন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমানের নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়।
তবে নুরুল আমিন বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীরাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালান। এ সময় আমাদের কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।’
দাসেরহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মতিন জানান, ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রচারের সময় পাঁচটি গাড়ি ভাঙচুর হয়।

এর আগেও হামলার শিকার হন শাহ মোয়াজ্জেম। নিজ দলের নেতা-কর্মীরাই এই ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ ছিল। তবে এবার তিনি দায়ী করেছেন সরকারি দলকে।
দুপুরে সিরাজদিখানের বয়রাগাদি ইউনিয়নের বড় পাউলদিয়া গ্রামে যান শাহ মোয়াজ্জেম। এ সময় ১৮ থেকে ২০টি মোটরসাইকেল নিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন অতর্কিত হামলা চালায়। তারা গাড়ির কাচ ভাঙতে শুরু করে।

সিরাজদিখান ও টঙ্গীবাড়ি সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বেশ কয়েকটি গাড়িতে ভাঙচুরের কথা শুনেছি। ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মিজানুর রহমান সিনহার গাড়িবহরেও হামলার অভিযোগ উঠেছে। রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি লৌহজংয়ে যাওয়ার পথে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বাহেরপাড়া এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এরপর সিনহাকে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে আনা হয়। চিকিৎসা শেষে তিনি বাসায় ফেরেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাফিজ আল আসাদ বারেক ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘মিজান সিনহার গাড়িতে কারা হামলা করেছেন, তা বলতে পারব না। ঘটনাটি সকালে শুনেছি।’

নড়াইল-২ আসনে হামলার অভিযোগ করেছেন বিএনপি জোটের প্রার্থী ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। বলেন, লোহাগড়া থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে নড়াইলের দিকে যেতে চাইলে এড়েন্দা বাসস্ট্যান্ডের কাছে তাদের ওপর হামলা হয়। কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের নেতা মতিয়ার রহমান লোকজনসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এই হামলা চালান।
তবে মতিয়ার বলেন, ‘এতে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিএনপির সমর্থকেরা আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করায় স্থানীয় লোকজন তাদের বাধা দেয়।’
ভোট থেকে সরার হুমকি মওদুদের

গাড়িবহরে হামলার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি দিয়েছেন নোয়াখালী-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মওদুদ আহমদ। তার অভিযোগ, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের নতুন বাজার এলাকায় তার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

বিএনপির নেতা বলেন, ‘আমার জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। আমি জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা, থানার ওসি ও সেনাবাহিনীর মেজরকে জানিয়েছি। জীবনের নিরাপত্তা না দিলে ২৪ ডিসেম্বর থেকে নির্বাচনী প্রচারণা থেকে সরে যাব।’

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘মওদুদ আহমদ তার গাড়িবহর নিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন দুর্বৃত্ত হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের নেতা মিজানুর রহমান বাদল বলেন, ‘মওদুদ আহমদ তার লোকজনকে দিয়ে এসব ঘটনা ঘটিয়ে প্রশাসনের আনুকূল্য চাইছেন।’

উজিরপুরে বিএনপি প্রার্থীর গুলি

বরিশালের বানারীপাড়ায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় গুলি করেন বরিশাল-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু। এ সময় দুই পক্ষে কমপক্ষে ২৫ জন আহত হন।

বিকেল চারটার দিকে বানারীপাড়া পৌরসভার সামনে এই ঘটনা ঘটে। ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল জোরদার করা হয়।
বিএনপির অভিযোগ, বানারীপাড়া উপজেলায় গণসংযোগ শেষে উজিরপুরে ফিরছিলেন সান্টু। পথে ৩০ থেকে ৪০ জন তার গাড়িবহরে হামলা করে।
থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জাকির হোসেন বলেন, ‘আমরা মিছিল বের করার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এ সময় সান্টু গাড়িবহর নিয়ে এসে আমাদের ওপর গুলি শুরু করেন।’

বানারীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, ‘সান্টু বলেছেন, আওয়ামী লীগের লোকজন তাদের গাড়িবহরে হামলা করে। তখন তিনি (সান্টু) চার রাউন্ড গুলি করেছেন।’

বরিশাল জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাঈনুল বলেন, ‘মারামারি এবং গোলাগুলি হয়েছে। এতে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পর পরই সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।’

চাঁদপুরে সংঘর্ষে আহত ৫০

চাঁদপুর সদর আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বেলা দেড়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত শহরের জে এম সেনগুপ্ত রোডের বেগম জামে মসজিদের সামনে এই সংঘর্ষ চলে। পরে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
বিএনপির প্রার্থী শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের অভিযোগ, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালায়। তারা আমার বাসভবনেও হামলা করে মূল ফটক ভাঙচুর করে।’

স্থানীয়রা জানান, সকালে গণসংযোগে বের হন মানিক। শহরের নতুনবাজার এলাকায় জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সলিম উল্ল্যাহ সেলিমকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর তাকে ছাড়িয়ে আনতে থানায় যান মানিক। সেখানে জড়ো হন বিএনপির শত শত নেতাকর্মী।
পরে বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে ফেরার সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাদের প্রার্থী দীপু মনির বাসার সামনে জড়ো হন। শুরু হয় দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। এ সময় পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা দুই পক্ষের মধ্যে অবস্থান নেন। পরে দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা তাদের প্রার্থীর বাসার সামনে ফিরে যান।

কুলিয়ারচরে পুলিশের ৭০ গুলি

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে (কিশোরগঞ্জ-৩) বিএনপির সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ৭০ রাউন্ড রাবার বুলেট ছোড়ে।
গতকাল বিকেলে বিএনপির প্রার্থী শরীফুল আলম এক থেকে দেড় হাজার নেতাকর্মী নিয়ে পৌরসভা রোডে মিছিল করছিলেন। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে জানিয়ে বাধা দেয় পুলিশ। তর্কবিতর্কের পর শুরু হয় সংঘর্ষ। পরে পুলিশ রাবার বুলেট শুরু করলে বিএনপির নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
শরীফুল আলম জানান, ‘পুলিশ অকারণে আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে। আমরা বাধা দিলে তারা গুলি করে ১০ জনকে আহত করে এবং ছয়জনকে আটক করে।’

কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নান্নু মোল্লা বলেন, ‘শরীফুল আলম আচরণবিধি লঙ্ঘন করে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে মিছিল করছিলেন। তারা পুলিশের ওপর আক্রমণ শুরু করলে পুলিশ আত্মরক্ষায় গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়।