নৌকাতেই হাট বাজার। শত শত নৌকায় পেয়ারা, আমড়া আর সবজির বাজার। কেনাবেচা নৌকাতেই। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে বেচা-বিক্রি। প্রকৃতির নৈসর্গিক পরিবেশে বসেছে জলের ওপর ভাসমান হাট-বাজার। আর এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে এখন প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ভিড় জমাচ্ছেন ঝালকাঠির ভিমরুলি গ্রামে। দৃষ্টিনন্দন এ পেয়ারা হাটকে থ্যাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেট কিংবা কেরেলার ব্যাকওয়াটার ট্রিপের সাথে তুলনা করছেন পর্যটকরা।
ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শেখ আবু বকর সিদ্দিক জানান, ঝালকাঠি সদর উপজেলার ২০টি গ্রামে ৫০০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়। শতবছর ধরে বংশানুক্রমেই এখানকার হাজার হাজার মানুষ কান্দি বা সজ্জন পদ্ধতিতে পেয়ারা চাষ করছেন। বছরের প্রায় ১২ মাসই এ অঞ্চলটি পানি বেষ্টিত থাকে। শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত এসব গ্রামে ভাসমান হাটে পেয়ারা বেচাকেনা চলে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসব হাট থেকে পেয়ারা কিনে নিয়ে যান।
ভাসমান হাটগুলোর মধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজলোর কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভিমরুলি গ্রামের ভিমরুলি খালের ওপরের ভাসমান হাটটি সবচেয়ে বড়। পেয়ারা ছাড়াও বছররে ১২ মাস ভাসমান এ হাটে কেনাবেচা হয় স্থানীয় কৃষকদের উত্পাদিত অন্যান্য কৃষি পণ্য।
আর এ সময় ক্রেতা-বিক্রেতা ছাড়াও দেশের বিভিন্নপ্রান্ত থেকে হাজারো পর্যটক আসেন ভাসমান বাজারের মনোরম দৃশ্য দেখতে। আসেন বিদেশিরাও।
ক’দিন আগে ঢাকা থেকে আসা হায়দার আলীর সাথে দেখা হয় হয় ভিমরুলির ভাসমান হাটে। তিনি বলেন, ‘এত বছরও এখানে তৈরি হয়নি পর্যটকদের জন্য কোনো বিশ্রামাগার। খাবারের জন্য নেই কোনো ভালো হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁ। তাই এখানে আসতে আসতেই ফিরে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করতে হয়।’
বরিশাল থেকে প্রথমবারের মতো পারভীন আক্তার আসেন তার স্বামী-সন্তান নিয়ে। তিনি বলেন, ‘এখানে নারী পর্যটকদের ভোগান্তি একটু বেশি। পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্য এখানে কোনো সুব্যবস্থা নেই। তাই গ্রামবাসীর ঘরে গিয়ে তাদের বিরক্ত করতে হয়। তবে এই হাটে এলে অন্যরকম অনূভূতির দেখা মেলে।’
এদিকে, পেয়ারা চাষি বলেন, অনেকে উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে ভাসমান হাটে নৌ-ভ্রমণে আসে। এতে করে অন্যান্য পর্যটকদের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য এমনকি কেনাবেচায়ও বিঘ্ন ঘটে। অসুবিধা হয় পার্শ্ববর্তী স্কুলের পাঠদানেও।
পেয়ারা এই নান্দনিক হাট পরিদর্শনে আসেন বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম। এ সময় সাথে ছিলেন ঝালকাঠি জেলা পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তাও। থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেট দেখার অভিজ্ঞতা তুলে তিনি ঝালকাঠির এ ভাসমান হাটটিকে পর্যটন সম্ভাবনার চোখে দেখছে বলে জানান। এ মৌসুমে পর্যটকের নিরাপত্তার বিষয় চিন্তা করে পুলিশের টহল চালু করা হয়েছে বলেও জানান বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের এ শীর্ষ কর্মকর্তা।
এখানের পেয়ারা বাগান মহান মুক্তিযুদ্ধের শোক আর গর্বের স্মৃতি বহন করে আসছে। একাত্তরের ৯ মাস ঝালকাঠি জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনী নির্মম গণহত্যা চলায়। এরমধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজেলার পেয়ারা বাগান এলাকার বিলাঞ্চলে নির্মম হত্যাযজ্ঞে শহীদ হন কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ। বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পেয়ারা বাগানে আশ্রয় নেওয়া অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এসব বিলাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে, হত্যা করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের। এ অঞ্চলে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবল প্রতিরোধ ও দুর্গ গড়ে তোলেন। পেয়ারা ঘন অরণ্যে ছিল তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। সেইসাথে বরিশাল বিভাগের হাজার হাজার মানুষ এ বাগানে আশ্রয় নেয়। গ্রামের ভিমরুলি খালে পাকবাহিনীর সাথে সিরাজ সিকদারের বাহিনীর কাছে কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয় পাকবাহিনী। আর সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে ভিমরুলিসহ আশেপাশের গ্রামে পাকবাহিনী পরে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুট ও অগ্নিসংযোগ করে।
পেয়ারা হাটে এসে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি রেজিস্ট্রার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ভাসমান নান্দনিক হাটের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের আগন্তুকরা এখানে এসে মুক্তিযুদ্ধোর স্মৃতিবিজরিত স্থানগুলোও দেখতে পাবেন, জানতে পারবেন একাত্তরের সেই দিনগুলোর শোক আর গর্ব গাঁথা ইতিহাস।’
খাল-বিল আর নদী বেষ্টিত বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর এবং ঝালকাঠি জেলায় বাংলাদেশের ভাসমান হাট বসছে ১২ মাস। এরমধ্যে ঝালকাঠি সদর উপজলোর ভিমরুলি গ্রামের এ ভাসমান হাটটি পর্যটনে একটি বড় সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে বলে আগন্তুকদের অভিমত। এরইমধ্যে দেশের পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টিতেও পড়ছে ভিমরুলির ভাসমান এ হাটটি। এখন প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার পর্যটকের আগমন হচ্ছে।
পর্যটকদের জন্য সুসংবাদ জানিয়েছেন ঝালকাঠি জেলা প্রাশাসক মো. হামিদুল হক। দূর থেকে আসা পর্যটকদের সুব্যবস্থা দিতে কয়েকবছর ধরেই চেষ্টা চালানোর পর পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে সম্প্রতি আর্থিক বরাদ্দ এসেছে। আর সেই বরাদ্দে একটি বিশ্রামাগারসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণের কাজ খুব শিগগিরই শুরু করা হবে। এছাড়া ঝালকাঠি জেলার ব্র্যান্ডিং হিসেবেও পেয়ারা চাষি ও দেশীয় জাতের এ পেয়ার মানোন্নয়নে নানা উদ্যোগ নেওয়ারও কথা জানান জেলা প্রশাসক।
অসংখ্য নদী-নালা আর খাল-বিল বেষ্টিত জেলা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে ভাসমান হাট বসছে প্রাচীনকাল থেকেই। তবে থাইল্যান্ড কিংবা ভারতের কেরালার পর ব্যাকওয়াটার ট্যুরিজমে ঝালকাঠির ভিমরুলির হাটটি এখন পর্যটকদের নজর কাড়ছে।
