ক্রিকেটার ইমরান আহমেদ খান নিয়াজী পিপি। ১৯৯২ সালে তিনি পাকিস্তানকে এনে দিয়েছিলেন ক্রিকেট বিশ্বকাপের মুকুট। তখন চারদিকে ছিল তার প্রশংসা। রোমনীমোহন প্লেবয় হিসেবে তিনি আলোচনায় ছিলেন। লন্ডনের নাইটক্লাবগুলো ইমরান ভালভাবে চিনতেন বলে পশ্চিমা সাংবাদিকদের ধারণা। তিনটি বিয়ে করেছেন। কোনো স্ত্রীই ঘরে নেই। এখন তিনি রাজনীতিক এবং পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তিনি শীর্ষদের প্রশংসা যেমন কুড়াচ্ছেন, তেমনি চারদিকে সমালোচনাও কম নয়। তিনি যে দেশের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সেই দেশটি সন্ত্রাসে জর্জরিত। জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থানে দেশটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ধূসর তালিকায় আছে। সেখানে ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রক সামরিক বাহিনী। ফলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে ‘স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচনের পরও গণতন্ত্র কতদিন টিকবে এবং ইমরানের ক্ষমতার স্থায়িত্ব কতদিন হবে।
আশঙ্কাটা কেন?: এটা পাকিস্তানে ১১তম জাতীয় নির্বাচন। বেসামরিক নাগরিক হিসেবে ইমরান খান জয় পেলেও নিরঙ্কুশ গণতন্ত্রের স্বপ্ন আবারও ফিকে হয়ে যাবে এমনটা আশঙ্কা করা হচ্ছে। ৭০ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, পাকিস্তানে কখনো আপাতদৃশ্যের গণতন্ত্র এসেছে। আবার পালাবদল করে এসেছে পুরোপুরি সামরিক সরকার। এই প্রক্রিয়ার মাঝে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের দ্বন্দ্ব এবং পাকিস্তান হয়ে উঠেছে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল। আসিফ আলী জারদারি ছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। এবারের নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে কেউ কেউ ‘গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানের’ ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। সেজন্য বরাবরের মতো এবারও সন্দেহ সামরিক বাহিনীকে। আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সরাসরি অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। নাহলে বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার বন্ধ হয়েছিল ২০০৮ সালে। সে কারণে প্রথমবারের মতো একটি নির্বাচিত সরকার তথা আসিফ আলী জারদারির সরকার ২০১৩ সালে মেয়াদ শেষ করতে সক্ষম হয়। তখন থেকেই দেশটিতে ফের গণতন্ত্রের স্রোত উল্টোদিকে বইতে শুরু করে। সমালোচকরা বলছেন, সামরিক প্রশাসন অতীতের মতো আবার পূর্ণ ক্ষমতা ফিরে পেতে পুরানো কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। সন্দেহের পিছনে তিন কারণ। প্রথমত, আদালত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফসহ বেছে বেছে বিদায়ী সরকারের কয়েকজনকে অভিযুক্ত করেছে। ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি শওকত আজিজ সিদ্দিকীর অভিযোগ, গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বিচারবিভাগে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে। নওয়াজ শরিফকে যেন মুক্তি দেওয়া না হয় সেজন্য সংস্থাটি চাপ সৃষ্টি করে বলে তিনি জানান।
পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের মোট আসন ৩৪২টি। সংরক্ষিত ও অন্যান্য বাদে ২৭২ আসনে নির্বাচন হয়। এবার ভোট হয়েছে ২৬৮ আসনে। এর মধ্যে ইমরানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পেয়েছে ১১৫ আসন। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন ন্যূনতম ১৩৭ আসন। তিনি আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, নওয়াজের দল পিএমএল এবং প্রয়াত বেনজির ভুট্টোর দল পিপিপি’র সঙ্গে জোট করবেন না। এজন্য তাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট করতে হবে। সমস্যাটা এখানেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অনেকের মতে, এসব স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ছোট দলগুলোর জয়ের পেছনে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা আছে। এই প্রার্থীরা তাদের নির্দেশেই চলবেন। ফলে ইমরান খান যদি ‘এস্টাব্লিশমেন্টে’র সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ান তাহলে ওইসব এমপি ইমরানের ওপর থেকে আশীর্বাদের হাত সরিয়ে নিতে পারেন। ফলে সরকারও ভেঙে যাবে। আর পুরানো সেই সুযোগটাই নেবে পাকিস্তানে আলোচিত ‘এস্টাব্লিশমেন্ট’।
নতুন প্রধানমন্ত্রীর যত চ্যালেঞ্জ: নির্বাচনের আগে ইমরান বলেছিলেন, জিতলে তার নজরের কেন্দ্রে থাকবে অর্থনীতি। পাকিস্তানের মুদ্রা রুপির মূল্যমান সমপ্রতি ২০ ভাগ পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম ঊর্ধ্বমুখী এবং রপ্তানি আয়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় বেড়েই চলছে। চীন থেকে সস্তা কাপড়-চোপড় আসায় দেশের বস্ত্রখাত সঙ্কটে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, ২০১৩ সালের পর পরিস্থিতি সামাল দিতে পাকিস্তানকে হয়তো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে যেতে হবে। বিবিসি’র সাংবাদিক সেকেন্দার কেরমানি বলছেন, সরকারি ব্যয় সঙ্কোচনসহ কঠোর কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে পরবর্তী সরকারকে। কেউ মনে করছেন, কিছুকাল পরই ইমরান খান দেখতে পাবেন যে, তিনি সামরিক ‘এস্টাব্লিশমেন্টে’র সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। তার দুই পূর্বসূরীর ক্ষেত্রে এটাই ঘটেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে এগোতে গেলে তাকে এমন পথ দিয়ে যেতে হবে যেখানে আগে থেকেই সামরিক বাহিনী বসে আছে।
আমলাতন্ত্র এবং বিচার বিভাগকেও সংস্কার করতে হবে। কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে গেলে দেখা যাবে, যেসব ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে সরকারকে জায়গা ছাড়তে হয়েছে তার পেছনেও সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা। সামরিক বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যখন পাকিস্তানের নাম সন্ত্রাসে অর্থায়নের তালিকায় উঠেছে, সে সময়ই আন্তর্জাতিক পরোয়ানায় থাকা কিছু জঙ্গি নেতা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এর পেছনেও নাকি সামরিক বাহিনী সমর্থিত একটি নীতি যার লক্ষ্য জঙ্গিদের রাজনীতির মূলধারায় সংযুক্ত করা। দিল্লি বা ওয়াশিংটন কেউই এটা পছন্দ করেনি এবং নির্বাচনী প্রচারণার সময় ইমরান খান বিষয়টি এড়িয়ে যান। তাই সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ইমরান খান সরকার গঠন করতে পারলেও ‘এস্টাব্লিশমেন্টে’র আশঙ্কা থেকেই যায়।
