উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ইয়েমেনে ২০১৪ সাল থেকে সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। ওই বছর হুতি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানাসহ দেশটির বড় একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। হুতিদের মাধ্যমে ইরান আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, এমন অভিযোগ তুলে ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক তত্পরতা শুরু করে। মূলত সৌদি আরবের হস্তক্ষেপের কারণেই ইয়েমেনের রাষ্ট্রক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে পারেনি হুতি বিদ্রোহীরা। তাই সুযোগ পেলেই সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে নেমে পড়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। যদিও তা নিয়ে খুব একটা মাথা ব্যথা নেই সামরিকভাবে শক্তিশালী সৌদি আরবের। কিন্তু এবার হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের তেলবাহী ট্যাংকার লক্ষ্য করে চামলা চালানোর ঘটনাটিকে বেশ গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করছে সৌদি আরব। ইতোমধ্যে বাব আল মান্দিব প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব।
অশোধিত তেলবাহী দুটি ট্যাংকার লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা চালানোর পর বিশ্বের সর্ববৃহত্ তেল রফতানিকারী দেশটি গত সপ্তাহ থেকে ওই জলপথ দিয়ে সাময়িকভাবে তেল পাঠানো বন্ধ রেখেছে। স্বাভাবিক অবস্থায় ওই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন ৪.৮ মিলিয়ন ব্যারেল শোধিত ও অশোধিত তেল পরিবাহিত হয়ে থাকে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রী খালিদ আল ফালিহ’র বক্তব্য, পরিস্থিতি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত ওই জলপথ দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকবে। হুতিরা এখন প্রায়ই লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। এর মধ্যে একটি জাহাজের সামান্য কিছু ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে।
অন্যদিকে হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে দেয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইয়েমেনের বন্দর হোদাইদার পশ্চিমে তাদের একটি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে। তবে হামলার ধরনটি কেমন ছিল বা কারা এই হামলা করে থাকতে পারে সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। সৌদি তেল কোম্পানি আরামকো অবশ্য বলেছে হুতি মিলিশিয়াদের হামলায় তাদের দুটি বড় আকারের অশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে আঘাত লেগেছে। তবে এতে কেউ হতাহত বা ট্যাংকার ফুটো হয়ে তেল চুইয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
হুতিদের পরিচালিত টিভি নেটওয়ার্ক আলমাসিরাহ অবশ্য একটি যুদ্ধজাহাজ টার্গেট করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কথা বলেছে। এর মধ্যে তেলের দর ব্যারেল প্রতি এক ডলার বেড়ে গেছে। বব কাভনার নামে একজন বাজার বিশ্লেষক বলছেন, ‘সৌদি অশোধিত তেল পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটলে বৈশ্বিক তেল বাজার ও অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়বে।’ তিনি বলেন, ‘সামান্য পরিমাণ ঘাটতিও যদি হয় যেমন দৈনিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল অশোধিত তেল কম সরবরাহ করা হয় তাহলেও বিশ্ব অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। যতদিন না নিরাপত্তা হুমকি প্রশমিত হবে ততদিন এই ঝুঁকি থাকবেই।
বাব আল মান্দিব প্রণালী লোহিত সাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্ব তেল বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে লোহিত সাগর রুট। সেখানে তেল পরিবহনে যেকোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ বা মিসরের মতো আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে হস্তক্ষেপ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যেকোন ধরনের আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ সৌদি আরবও সাদরেই গ্রহণ করবে। এসব বিষয় মাথায় রেখে বিশেষ করে নির্বিঘ্নে তেল পরিবহনের পরিবেশ তৈরি করতে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় হুদাইদা বন্দর ঘিরে এখন সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট তাদের রণকৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। তিন বছর ধরে চলে ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযানের টার্নিং পয়েন্ট হতে চলেছে এই বন্দর। সৌদি মদদপুষ্ট ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীও ১৩ জুন থেকে হুদাইদা শহর টার্গেট করে অভিযান শুরু করেছে। ১৯ জুন সরকারি বাহিনী হুদাইদা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি দখল করে নিলেও এরপর তারা আর কোন সাফাল্য দেখাতে পারেনি। ইয়েমেন অভিযানের পেছনে সৌদি আরব ও আমিরাতের অন্যতম যুক্তি হলো লোহিত সাগরকে বাণিজ্যিক নৌ চলাচলের জন্য নিরাপদ রাখা। লোহিত সাগরের মধ্য দিয়েই তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ইউরোপ ও আমেরিকায় তেল সরবরাহ করে থাকে। জোট বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তারা এ বছর এপ্রিল ও মে মাসেও লোহিত সাগরে কয়েকটি হামলা প্রতিরোধ করেছে। তাদের অভিযোগ হুদাইদা বন্দর দিয়েই হুতিরা অস্ত্র চোরাচালান করে থাকে। অভিযান শুরুর পর নগরীর ১ লাখ ২১ হাজার বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘর ছেড়েছে বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে জানান হয়েছে।
হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি জোটের বিরুদ্ধে যে অসম যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির সাধারণ মানুষ। ইয়েমেনে এখন চরম মানবিক সংকটে ধুঁকছে। দেশটির ২ কোটি ২২ লাখ জনসংখ্যার বড় একটি অংশ কলেরা ও অপুষ্টিসহ নানা সমস্যার শিকার। অন্যদিকে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর বাজেট বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। স্টোকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, ২০১৭ সালে এমনকি রাশিয়ার চেয়েও সামরিক খাতে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে সৌদি আরব। সৌদি আরবের মতো আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীরও রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। স্টোকহোম রিসার্চ ইনস্টিটিউট দাবি করে, সামরিক খাতে অর্থ ব্যয়কারী দেশের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ১৫ এ ও তালিকায় থাকা উচিত আমিরাতের। তাই এমন অসম যুদ্ধের মাধ্যমে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবকে শুধু অশান্ত করার অপচেষ্টাই করতে পারে, সাফল্য পাওয়াটা শুধু কঠিনই না রীতিমতো অসম্ভব।
