জাপানের কলঙ্কিত এক অধ্যায় ‘ওম শিনরিকিও’র অবসান

জাপানে বিতর্কিত ধর্ম ‘ওম শিনরিকিও’ প্রবর্তক শোকো আসাহরা। শোকো আসাহরার আসল নাম অবশ্য চিজিও মাতসুমতো। ১৯৭৭ সালে লেখাপড়া শেষ করে মাতসুমতো আকুপাংচার এবং চীনা ভেষজ চিকিত্সা শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। অবসর সময়ে ধর্ম বিষয়ক পড়াশোনার মধ্যে ডুবে থাকতেন মেধাবী মাতসুমতো। চীনা জ্যোতিষবিদ্যা, বৌদ্ধধর্ম, জৈন ধর্ম, তাওবাদ এবং দর্শনের ইতিহাস নিয়ে বিশদ গবেষণার দিকে ঝুঁকে পড়েন মাতসুমতো। ষোড়শ শতকের ফরাসি জ্যোতিষ নস্ট্রাডামুসের লেখাও পড়তেন গভীর মনোযোগ দিয়ে। এক সময়ে ভারতীয় যোগবিদ্যা এবং বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কেও প্রবল কৌতূহল তৈরি হয়েছিল মাতসুমতোর। ভারতের পতঞ্জলি যোগশাস্ত্র সম্পর্কে বিশদ জ্ঞানার্জনের জন্য ওই সময়ে তিনি ভারতে যান। ১৯৮৪ সালে ভারত থেকে দেশে ফিরে নিজের নাম বদলে রাখেন শোকো আসাহরা। ভারতে থাকার সময় আয়ত্ত করা যোগশাস্ত্র শেখানোর মধ্য দিয়ে একসময় প্রচুরসংখ্যক শিষ্য তৈরি করেন শোকো আসাহরা। সেই শিষ্যদের মধ্যে অতিপ্রাকৃত শক্তি লাভের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় শিষ্যদের মাঠে ছড়িয়ে দিতে থাকেন বহুধর্মের মিশেলে তৈরি ‘ওম শিনরিকিও’।

‘ওম শিনরিকিও’র ধর্মীয় আদর্শ পালি ভাষায় বুদ্ধের আদিশিক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। জাপানি ভাষায় ‘শিনরিকিও’ শব্দের অর্থ হলো ‘পরম সত্য’। শোকো আসাহরার বিশ্বাসের মূল ভিত্তি ছিল বৌদ্ধ ধর্ম, অ্যাপোকালিপটিক খ্রিস্টধর্ম এবং ফরাসি জ্যোতিষ নস্ট্রাডামুসের লেখনী। শোকো আসাহরার প্রতিষ্ঠিত ধর্ম তার ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে যতটা না পরিচিতি লাভ করেছিল তার চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছিল ১৯৯৫ সালে জাপানের টোকিও’র পাতাল রেললাইনে তার শিষ্যরা বিষাক্ত সারিন গ্যাস প্রয়োগের মাধ্যমে ১৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে।

‘ওম শিনরিকিও’র সদস্যরা ২০ মার্চ টোকিওর পাতাল রেললাইনে সারিন গ্যাস ভর্তি কয়েকটি ব্যাগ ফেলে রেখেছিল। ওই ব্যাগগুলো কৌশলে ছিদ্র করে রেখেছিল। কিছু বুঝে উঠার আগেই অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন। এ ঘটনায় মারা যান ১৩ জন সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া অনেকেই অন্ধ হয়ে যান, কেউ কেউ চলাচলের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তী কয়েক মাসে দলটি আরও কয়েকটি রেলস্টেশনে রাসায়নিক হামলার চেষ্টা করে। এমন কাপুরুষোচিত হামলার ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েন জাপানের জনগণ। শেষ পর্যন্ত এক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়তে থাকে ‘ওম শিনরিকিও’র সদস্যরা। ওই ঘটনার ১১ বছর পর ২০০৪ সালে দীর্ঘ বিচারের পর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন ‘ওম শিনরিকিও’র প্রতিষ্ঠাতাসহ কয়েক জন সদস্য। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ১৪ বছর পর সেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করল জাপান।

১৯৮৪ সালে ‘ওম শিনরিকিও’র প্রতিষ্ঠার পরই এর স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছিলেন শোকো আসাহরা। অবশেষে ১৯৮৯ সালে জাপান আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে ‘ওম শিনরিকিও’র স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই সময় থেকে বিশ্বজুড়েই বাড়তে থাকে ‘ওম শিনরিকিও’র সদস্য তথা শোকো আসাহরার অনুসারী। ‘ওম শিনরিকিও’ ধর্মের বিধিনিষেধ এবং নিয়মকানুন সম্পর্কে তিনি কিছু বইও লিখেছিলেন। এই বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘বিয়ন্ড লাইফ অ্যান্ড ডেথ’ ও ‘মহায়ানা সুটরা অ্যান্ড ইনিটিয়াশন’। সবকিছু ঠিকই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আসাহরার প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় নিজেকে আর নিজের দলকে অধিষ্ঠিত করা। এই লক্ষ্যে চলতে গিয়েই মূলত জঙ্গি কার্যক্রম শুরু করে তার শিষ্যরা। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৯৫ সালে পাতাল রেলে হামলার মধ্য দিয়ে। হামলার পর সংগঠনটির সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যায়। যদিও ওই ঘটনার পর একে একে ধরা পড়তে শুরু করে ‘পাণ্ডারা’। পালের গোদা শোকা আসাহরাও পুলিশের জালে ধরা পড়েন। শোকো আসাহরার গ্রেফতার ও বিচারের পর ২০০০ সালে তার ধর্মের নাম পরিবর্তন করে ‘আলেফ’ রাখা হলেও তা আগের মতো জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। টোকিও হামলার দীর্ঘ ২৩ বছর পর এ মাসেই শোকো আসাহরা এবং তার কয়েক জন শিষ্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে জাপানের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক এক অধ্যায়ের অবসান ঘটল।