উচ্ছল মুশফিক বাংলাদেশের স্বস্তি

গোল হয়ে তাঁরা বসেছেন পেগাসাস হোটেলের কফিশপে বৈকালিক আড্ডায়। মধ্যমণি অভাবিত একজন। নিজে হাসছেন, খেলোয়াড়ি জীবনের মজার মজার গল্প করে সঙ্গীদের হাসাচ্ছেন মুশফিকুর রহিম। সাধারণত সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি সেসব আড্ডার গতিপথ বদলে দেয়, তাঁর তো মুডই বদলে যায়! তবে সোমবারের মুশফিক এর কোনোটাই বদলে যেতে দেননি। হাসিঠাট্টা তাঁর চলতেই থাকে মাগরিবের আজান অবধি।

এমন নয় যে মুশফিক খুব কাঠখোট্টা। দলের বন্ধুদের সঙ্গে ইয়ার্কি-ঠাট্টা করেন তিনিও। তবে তাঁর মেজাজ-মর্জির সঙ্গে ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মের আবহাওয়ার নাকি বড্ড মিল, কখন যে ‘মুড সুইং’ করে—এ নিয়ে ধন্দে থাকেন তাঁর পুরনো বন্ধুরাও। সেখানে মুস্তাফিজুর রহমান কিংবা নাজমুল হোসেনরা তো হাঁটুর বয়সী। মুশফিকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠা মেহেদী হাসান মিরাজের চোখেও দেখি চকিত ভয়—কোন কথায় না আবার তেতে ওঠেন ‘মুশি ভাই’! নাহ, ১১ বলে ৩০ রানের ঝড় তোলা মুশফিকের মনে ছন্দপতনের কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। তার মানে বহুলচর্চিত অনুমানটাই সত্যি—নিজের ফর্মের সঙ্গে ওঠানামা করে তাঁর রাগ-বিরাগ। রান না পেলে তিনি ছাত্রদের ওপর মহাবিরক্ত অঙ্কের শিক্ষক। আর ব্যাটে ফুল ফুটলে মুশফিক আর সব আড্ডাবাজদের মতোই মুখর।

বাংলাদেশ দলে মুশফিকের ‘বিখ্যাত’ রাগ-বিরাগ সবচেয়ে ভালো বোঝেন তামিম ইকবাল। খারাপ সময়ে তাই অনেকে তাঁকে এড়িয়ে চলেন, কেউবা বিরক্তও হন। ব্যতিক্রম তামিম, নিজস্ব একটা বিশ্লেষণ দিয়ে মনের রিখটার স্কেলে মুশফিকের উত্থান-পতনটা একরকম মেনেই নিয়েছেন, ‘মুশফিকের সিরিয়াসনেস নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। হতে পারে একটু কম সিরিয়াস হলে ভালো হতো। কিন্তু বিষয়টি অন্যভাবে যদি দেখেন তাহলে মুশফিকের এই সিরিয়াসনেসটাই তো ভালো। একটা ছেলে বছরের পর বছর প্রতিটি ম্যাচে নিজের ব্যর্থতায় মন খারাপ করছে, আরো বেশি প্র্যাকটিস করছে—এটা তো খারাপ কিছু না। এটাই ওকে আরো ভালো খেলার জন্য তৈরি করেছে। বেশি না, গত চার-পাঁচ বছরে ওর পরিসংখ্যান দেখুন। রানগড়, স্ট্রাইকরেট সবই বেড়েছে। আর ভাই, একেকজন মানুষ একেক রকম। ওকে দেখে আমার মনে হয় ওর মতো প্যাশনেট যদি হতে পারতাম!’

চলমান সে আড্ডার মাঝপথে এসে যোগ দেন সাকিব আল হাসান। সঙ্গে একটা আইস প্যাক। না, তাঁর কিছু হয়নি। কন্যা পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে। তাই ওটা নিতে নেমেছিলেন নিচে। তবে জমে ওঠা আড্ডায় বসে পড়েন তিনিও। যাওয়ার আগে আলাদা করে বলে গেলেন সাকিব, ‘মুশফিক ভাই যদি ওই ইনিংসটা না খেলত, তাহলে জেতা অত সহজ হতো না।’

আসলেই। তামিম-সাকিবের ২০৭ রানের জুটির পরও একটা সময় আড়াই শ রানের নিচে থেমে পড়ার আশঙ্কা ছিল। তেমনটা হলে মানসিক শক্তির ভারসাম্য এতটা ঝুঁকে পড়ত না বাংলাদেশের দিকে। মুশফিকও যে তাঁর প্রায় দ্বিগুণ উচ্চতার জেসন হোল্ডারকে গ্যালারিতে আছড়ে ফেলবেন শুরু থেকেই, কে ভেবেছিল? সেট হওয়ার জন্য কয়েকটা বল খেলা লাগে তাঁর।

সে কারণেই মুশফিকের আগে সেদিন ব্যাটিংয়ে পাঠানো হয় সাব্বির রহমানকে। কিন্তু মাঠে নেমে প্রথম বল থেকেই অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন মুশফিক, তোলেন ৩ বাউন্ডারি আর দুই ছক্কার ঝড়। এর সবগুলো শটই তিনি আগে কখনো না কখনো খেলেছেন। তবে নেমেই মুশফিকের এমন শট খেলা রবিবারের ম্যাচেই প্রথম। তাঁর ইনিংসটি ওয়ানডেতে বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ স্ট্রাইকরেটের, ২৭২.২। ২৭৫ স্ট্রাইক রেট নিয়ে এ তালিকার শীর্ষে আছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা, ২০০৬ সালে বগুড়ায় কেনিয়ার বিপক্ষে তিনি ১৬ বলে খেলেছিলেন ৪৪ রানের হার না মানা ইনিংস। সমান স্ট্রাইকরেট নিয়ে ওয়ানডে অধিনায়কের পাশেই আছেন সহ-অধিনায়ক সাকিব। ২০১৪ সালে ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৬ বলে ৪৪ রান করে অপরাজিত ছিলেন তিনিও।

মুশফিকের রবিবারের ইনিংসকে ঘিরে মোবাইলে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু হয়ে যায় স্ট্রাইকরেটেও। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেও ডট বল দেওয়ার জন্য সমালোচিত তামিম সোৎসাহে জানাতে থাকেন কার কত স্ট্রাইকরেট। চলতে থাকে বিশ্লেষণও। তামিমই খুঁজে বের করলেন মুশফিকের সাম্প্রতিক উল্লম্ফনের অঙ্ক, ‘২০১৪ সালের আগে ওয়ানডেতে তোর (মুশফিক) স্ট্রাইকরেট ছিল ৬০। আর এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ৭৭ প্লাস (৭৭.১৬)!’ তার মানে নেটে অযথাই স্ট্রাইকরেট বাড়ানোর উপযোগী স্লগ সুইপ অথবা রিভার্স সুইপ অনুশীলন করেন না মুশফিক, প্রস্তুতির প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন মাঠেও।

অবশ্য তিনি তো আর ছয়-সাত কিংবা আট নম্বরের ব্যাটসম্যান না। তাই এমন পরিস্থিতি খুব নিয়মিত আসার সম্ভাবনা কম। বরং মিডল অর্ডারে নেমে দলের হাল ধরাই তাঁর কাছে প্রত্যাশিত। মুশফিকের ফর্ম নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল না। তবে টেস্ট সিরিজের ধাক্কায় মুশফিকের মুষড়ে পড়াটা ছিল উদ্বেগজনক। রবিবারের গায়ানা তাঁর মনে ফিরিয়ে দিয়েছে উচ্ছলতা।

বাংলাদেশ দলের সিরিজ নির্ধারণী পরিকল্পনার জন্য এটা বড় সুখবরই!–কালের কন্ঠ