বগুড়ায় ৮ বছর পর ছাত্রদলের কমিটি, ৫ সদস্যের ৪ জনই বিবাহিত

বগুড়া জেলা ছাত্রদলের নতুন সভাপতি আবু হাসান ও সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম সিদ্দিকীআট বছর পর বগুড়া জেলা ছাত্রদলের পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিবাহিত ও অছাত্রদের নিয়ে এই কমিটি ঘোষণা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আজ মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকরামুল হাসান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে পাঁচ সদস্যের এই কমিটি ঘোষণা করা হয়।

দীর্ঘ আট বছর পর সম্মেলন ছাড়াই কমিটি ঘোষণায় পদবঞ্চিত নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁরা অভিযোগ করছেন, কমিটির শীর্ষ চারজনই বিবাহিত এবং অছাত্রদের নিয়ে এই কমিটি ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ঘোষিত কমিটিতে ‘তারেক মডেল’ অনুসরণ না করে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ‘খাটো’ করা হয়েছে।

ছাত্রদলের নেতারা বলছেন, কমিটিতে সক্রিয়, মেধাবীদের স্থান দিতে তারেক রহমানের অনুসৃত নীতিই ‘তারেক মডেল’ নামে পরিচিত।

পদবঞ্চিত সরকারি আজিজুল হক কলেজ ছাত্রদলের এক নেতা আক্ষেপ করে বলেন, দেশে থাকাকালীন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নিজ হাতে বগুড়া ছাত্রদলকে সুসংগঠিত করেছেন। অথচ এবারের পাঁচ সদস্যের জেলা কমিটির সিংহভাগ নেতাই নিয়মিত ছাত্র নন এবং পাঁচ সদস্যের কমিটির চারজনই বিবাহিত।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, পাঁচ সদস্যের ঘোষিত কমিটিতে আবু হাসানকে সভাপতি, আবু জাফর ওরফে জেমসকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, নূরে আলম সিদ্দিকী ওরফে রিগ্যানকে সাধারণ সম্পাদক, সোহেল রানাকে যুগ্ম সম্পাদক ও রবিউল ইসলাম ওরফে আওয়ালকে সাংগঠনিক সম্পাদক ঘোষণা করা হয়েছে।

জানা যায়, জেলা ছাত্রদলের সভাপতির পদ পাওয়া আবু হাসান এর আগে সরকারি শাহ সুলতান কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। তবে ‘ছাত্রত্ব’ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। বিয়েও করেছেন ইতিমধ্যে। আবু হাসান প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে ২০০৮ সালে বিএ (পাস) এবং ২০১২ সালে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন তিনি। তবে এখনো ছাত্রত্ব শেষ হয়নি দাবি করে তিনি বলেন, এখন পড়ছেন বগুড়া ল কলেজে।

নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদকের পদ পাওয়ার আগে নূরে আলম সিদ্দিকী ছিলেন সরকারি আজিজুল হক কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। স্নাতকোত্তর পাসের পর থেকেই এই নেতার ছাত্রত্ব শেষ হয় এবং বিয়েও করেছেন তিনি। নূরে আলম সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি আজিজুল হক কলেজে উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়ে সম্মানে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন।

আগের কমিটির কোনো পদে ছিলেন না আবু জাফর। নতুন কমিটিতে তিনি সহসভাপতি পদ পেয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে ২০১১ সালে বিএসএস পাস করেছেন। বর্তমানে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি রয়েছেন। এখনো তাঁর ছাত্রত্ব রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

রবিউল ইসলাম সরকারি আজিজুল হক কলেজ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। নতুন কমিটিতে তিনি সাংগঠনিক পদ পেয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে ২০১১ সালে সম্মান এবং ২০১৩ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এখন অন্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন।

আগের কমিটিতে কোনো পদে না থেকেও যুগ্ম সম্পাদকের পদ পেয়েছেন সোহেল রানা। বিবাহিত এই ছাত্রনেতা বলেন, ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি আজিজুল হক কলেজে ইসলামি ইতিহাস বিষয়ে সম্মান এবং ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। বর্তমানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করা ছাড়াও আইন বিষয়ে এএলএম ডিগ্রির জন্য পড়াশোনা করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতা বলেন, সংগঠনকে চাঙা করতে দীর্ঘ আট বছর পর ছাত্রদলের এই কমিটি নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল তাঁদের। ত্যাগী ও মাঠের নেতারা এই কমিটিতে স্থান পাবেন, এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু অছাত্র ও বিবাহিতদের নিয়ে ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা দেওয়ায় হতাশ তাঁরা।

নতুন কমিটির সভাপতি আবু হাসান বলেন, এই পদ তাঁদের প্রাপ্য ছিল। যোগ্য, ত্যাগী ও মাঠের নেতাদের নিয়েই কমিটি হয়েছে। এই কমিটি তারেক রহমানের বগুড়ায় বিএনপির সহযোগী সংগঠন হিসেবে ‘গণতন্ত্র’ পুনরুদ্ধারে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকবে।

সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, আট বছর ধরে কমিটি না হওয়ায় জেলা কমিটিতে পদ-পদবি পাওয়ার যোগ্য অনেক ত্যাগী নেতারা অপেক্ষায় ছিলেন। নতুন কমিটিতে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হয়েছে। বেশি দেরিতে কমিটি হওয়ায় কারও কারও নিয়মিত ছাত্রত্ব নেই সত্যি, তবে ছাত্রদলের আন্দোলনের মাঠে সব সময় সক্রিয় তাঁরা।

তারেক রহমানের পরামর্শেই নতুন কমিটি ঘোষণা হয়েছে বলে দাবি করেছেন জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি হাসানুজ্জামান পলাশ। বলেন, বিবাহিতরা কমিটিতে থাকতে পারবেন না—এমনটা ছাত্রদলের গঠনতন্ত্রের কোথাও উল্লেখ নেই।

জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, জেলা বিএনপির সঙ্গে পরামর্শ করে যোগ্য ও ত্যাগী কর্মীদের নিয়েই ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

সাংগঠনিক সূত্রে জানা যায়, দুই বছর মেয়াদি বগুড়া জেলা ছাত্রদলের সর্বশেষ কমিটি হয়েছে ২০১০ সালের ৪ জুন। সব সাংগঠনিক কমিটি থেকে শীর্ষ পাঁচজন এবং জেলা কমিটির ৮১ জনের মতামতের ভিত্তিতে কেন্দ্র থেকে বগুড়া জেলা ছাত্রদলের পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। দীর্ঘ আড়াই বছরের মাথায় ২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্র থেকে ৮১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটি ঘোষণার পর থেকেই জেলা ছাত্রদলের বিভেদ প্রকাশ্যে আসে। এক পক্ষের নেতৃত্ব দেন জেলা সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, অন্য পক্ষের সাধারণ সম্পাদক শাহাবুল আলম। দুই পক্ষ জড়িয়ে পড়েন সংঘাত-সংঘর্ষে। অন্তঃকোন্দলে ২৯টি সাংগঠনিক কমিটির সম্মেলন করতে ব্যর্থ হয়।

এখন জেলা ইউনিটসহ ২৩টিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। আট বছর ধরে ১২ উপজেলা ও ১০ পৌরসভাসহ ২৩টি ইউনিট চলছে পাঁচ সদস্যের কমিটিতে। কমিটি নেই বগুড়া শহর, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজসহ চারটি ইউনিটে। আর সরকারি আজিজুল হক কলেজে আট বছর ধরে চলছে ১১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে।