আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ঝড় বইছে! ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে চলছে নতুন নতুন মেরুকরণ। বিশ্বজুড়ে চলমান এই কূটনৈতিক ঝড় এবার আছড়ে পড়েছে কানাডায়। সম্প্রতি সৌদি আরবে আটক নারী অধিকার আন্দোলনের কর্মীদের মুক্তি দিতে দেশটির সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় কানাডা। আর তাতেই রেগে আগুন সৌদি সরকার। গত এক সপ্তাহের মধ্যে তারা কানাডার কূটনীতিককে বহিষ্কারের পর নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়েছে। একইসঙ্গে কানাডায় অধ্যয়নরত সৌদি শিক্ষার্থীদের ফেরত আসতে বলেছে। কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য এবং চলমান মেডিক্যাল কর্মসূচিও স্থগিত করেছে। সরাসরি বিমান চলাচলও বন্ধ রাখা হয়েছে।
সামান্য এক বিবৃতিতে সৌদি আরব এমন পদক্ষেপ নেবে কানাডা এটা স্বপ্নেও ভাবেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, কানাডা-সৌদি বিরোধ বিশ্বে মানবাধিকার নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা এনে দিতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই বিরোধ শুধু একটি বিবৃতিকে কেন্দ্র করে নয় বরং সৌদি আরব কানাডাকে ব্যবহার করছে অন্যসব দেশকে সতর্ক করতে।
ইউনিভার্সিটি অব ডেনভার এর সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্টাডিস-এর পরিচালক নাদের হাশেমি সম্প্রতি আল জাজিরাকে বলেন, এটা স্পষ্ট যে, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান কানাডাকে ব্যবহার করছেন বাকি বিশ্বকে বার্তা দিতে। সৌদি আরব বলছে, যদি আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে চাও তবে মানবাধিকার ইস্যুতে মুখ বন্ধ রাখো। হাশেমির মতে, কানাডার সঙ্গে সৌদি আরবের কূটনৈতিক উত্তেজনার মূল কারণ হলেন মোহাম্মদ বিন সালমান নিজে। এই ক্রাউন প্রিন্স ক্ষমতার মধ্যে ডুবে আছেন। তিনি খুবই উদ্ধত এবং বিশ্বাস করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পেছনের পকেটে রয়েছেন। আর এ কারণে তিনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন।
কানাডার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদির মিত্ররা সমর্থন দিয়েছে। আর পশ্চিমা দেশগুলোও এখন পর্যন্ত নীরব ভূমিকা পালন করছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো-এই মুহূর্তে কানাডাকে সহায়তা ও সমর্থন করার মতো অবস্থানে নিজেকে দেখছে না কোনো পশ্চিমা দেশই। লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক চাথাম হাউসের ফেলো পিটার সালিসবুরির মতে, এটা খুবই হতাশার। হয়তো কয়েক বছর আগে এ ঘটনা ঘটলে অনেক পশ্চিমা দেশই কানাডার পক্ষে স্বোচ্চার হতো। আর এই বাস্তবতায় কানাডা আর একটি বিষয় ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে যে, এই সংকটে তাদের পাশে কেউ নেই। কানাডা এখন বন্ধুহারা বিচ্ছিন্ন এক রাষ্ট্র!
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে কানাডার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কে পরিবর্তন আসার ইঙ্গিত মেলে। নাফটা নিয়ে আলোচনা, অভিবাসন ও সাম্প্রতিক বাণিজ্য শুল্ক ইস্যুতে সেটা দেখা গেছে। সর্বশেষ সৌদি-কানাডা উত্তেজনায় সেটা আরো স্পষ্ট করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার এর পলিসি ডিরেক্টর র্যাচেল কারান এক টুইট বার্তায় বলেন, সারা বিশ্বে এখন আমাদের একজন বন্ধুও নেই। লিবারেল পার্টির সাবেক নেতা বব রে’ও বলেছেন, যুক্তরাজ্য এখন নীরব দর্শক। তারা একইসঙ্গে কানাডা ও সৌদি আরবের ভালো বন্ধু ছিল। অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থমাস জুনো’র মতে, এই বিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা দরকার কানাডার নেই। কারণ সৌদি আরব-কানাডার সম্পর্ক খুবই সীমিত। তবে এটি স্পষ্ট যে আমরা এখন একা। বাস্তব সংকটে আমরা কী করবো সেটাই ভাবতে হবে।
বার্তা সংস্থা বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে সম্প্রতি বলা হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে উত্তেজনা নিরসনে মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চেয়েছিল কানাডা। কিন্তু দেশগুলো আগ্রহ দেখায়নি। যুক্তরাষ্ট্রও এই সংকট নিরসনে এগিয়ে আসতে আগ্রহী নয়। আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশকে সংকট এড়াতে পরামর্শ দিয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে সৌদি আরব বলেছে, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের নাক গলানো সহ্য করবে না তারা। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-জুবেইর স্পষ্ট বলেছেন, কানাডা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে ভুল করেছে। তাদের এর মাশুল দিতে হবে। বল এখন কানাডার ঘরে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উত্তেজনার সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো রিয়াদের চরম আগ্রাসী মনোভাব আর অটোয়ার ছাড় না দেওয়ার মনোভাব। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে চায় কানাডা। তবে অটোয়া মানবাধিকার ইস্যুতে রিয়াদকে চাপ দিয়ে যাবে। সৌদি আরব ও কানাডার অনমনীয় মনোভাব এবং সংকট নিরসনে ক্ষমতাধর দেশগুলোর অনাগ্রহ, এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
