বাংলাদেশ সংবিধান অনুচ্ছেদ ২৮(২)-এ বলা আছে ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবে।’ সংবিধানে এই সমান অধিকারের কথা উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশে প্রচলিত আইন নারীর প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে। আর এই আইনগুলোই আমাদের গণজীবনের অনেক সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করা হয়।
অভিভাবকত্ব ও জিম্মাদারিত্ব
অনেক প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ আইনের মধ্যে ‘অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০’ একটি। এই আইন অনুসারে অভিভাবক বলতে বোঝায়— যে ব্যক্তি কোনো নাবালকের শরীর বা সম্পত্তির অথবা উভয়ের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত থাকে। আর জিম্মাদারিত্ব বলতে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সন্তানের লালন-পালন, রক্ষণাবেক্ষণ, সার্বক্ষণিক দেখাশোনা এবং যত্ন করার অধিকারকে বোঝায়। জিম্মাদার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না।
বাংলাদেশে নাবালকের বয়স নির্ধারিত হয় সাবালকত্ব আইন, ১৮৭৫ অনুসারে, যেখানে একজন নারী ও পুরুষ ১৮ বছর পূর্ণ হলে সাবালক হয়। এই আইন বাংলাদেশের সকল নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের সন্তানের অভিভাবকত্ব
মুসলিম আইনে বাবা হলেন নাবালক সন্তানের শরীর ও সম্পত্তির স্বাভাবিক অভিভাবক। বাবার অভিভাবকত্বের ব্যাপারে তার অধিকারের সমর্থনে আদালত কর্তৃক কোনো আদেশ প্রদানের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ হলে বা কারো মৃত্যু হলে অথবা উভয়ে একত্রে বসবাস না করলে সাধারণত সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রেও মা শুধু সাত বছর পর্যন্ত ছেলে সন্তানকে ও বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত মেয়ে সন্তানকে কাছে রাখতে পারে এবং মায়ের এই অধিকারকে বলা হয় জিম্মাদারিত্ব। অর্থাত্ জিম্মাদারের কাজ হলো অধিকার ছেড়ে শুধু কর্তব্য করে যাওয়া। সুতরাং মা সন্তানকে কিছু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লালন-পালন করতে পারে। কিন্তু সন্তানের শরীর ও সম্পত্তির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
কী কী কারণে জিম্মাদারিত্ব হারায়
মা-ই নাবালক সন্তানের জিম্মাদারিত্বের অধিকার পেয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা জানতে পারি যে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে মা জিম্মাদারিত্বের অধিকার হারাতে পারে। যেমন— অনৈতিক জীবনযাপন করলে, মা পুনরায় বিয়ে করলে, সন্তানের প্রতি অবহেলা করলে ও দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে। তবে আদালতের আদেশ ছাড়া মাকে এই জিম্মাদারের অধিকার থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। মা তালাক দিলেও সন্তানের জিম্মাদারিত্বের অধিকার হারায় না। তা ছাড়া রক্ত সম্পর্কের কারণে যাদের সঙ্গে বিয়ে আইনত নিষিদ্ধ, যেমন চাচা, মা সন্তানের এমন আত্মীয় কাউকে বিয়ে করলে তার জিম্মাদারিত্ব বহাল থাকে। কিন্তু আদালত যদি মনে করে অন্যত্র দ্বিতীয় বিয়ে করলেও মার সঙ্গে থাকলেই সন্তানের কল্যাণ হবে, তাহলে আদালত সে ক্ষেত্রেও মাকে সন্তানের জিম্মাদারিত্ব দিতে পারেন। অর্থাত্ এসব ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় সন্তানের মঙ্গল ও স্বার্থ।
পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫ অনুসারে নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণ নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবক হওয়ার অধিকারী। অগ্রগণ্যতার ক্রম নিম্নরূপ— বাবা, বাবা কর্তৃক নিয়োগকৃত ব্যক্তি; বাবার বাবা অর্থাত্ দাদা, দাদা কর্তৃক নিয়োগকৃত ব্যক্তি।
যদি এইসব ব্যক্তি না থাকে, তাহলে আদালত কর্তৃক নিয়োগকৃত আইনগত অভিভাবকই নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবক। এ ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই যে, মা কেবল একজন তত্ত্বাবধায়ক এবং সে নাবালক সন্তানের কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারে না, যদি না আদালত কর্তৃক সম্পত্তির অভিভাবক নিযুক্ত হয়। এই মা বা নারী তার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সন্তানের অভিভাবক হতে পারে না বিভিন্ন আইনগত বাধার কারণে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সন্তানের অভিভাবকত্ব
হিন্দু আইনেও নাবালকের প্রকৃত এবং স্বাভাবিক অভিভাবক তার বাবা। বাবা জীবিত অবস্থায় উইল করে অন্য কাউকে নাবালকের অভিভাবক নিযুক্ত করে গেলে মা অপেক্ষা সেই ব্যক্তির দাবি অগ্রগণ্য হবে। শুধু মা অবৈধ সন্তানের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অভিভাবক। কিন্তু বাবার সন্ধান বা পরিচয় জানা গেলে বৈধ অভিভাবক হিসেবে বাবার অগ্রাধিকার স্বীকৃত হবে। মা যদি পরে বিবাহ করে কেবল এ কারণে তার নাবালক সন্তানের অভিভাবক হতে বঞ্চিত হবে না এবং ধর্মান্তরজনিত কারণেও মা অবৈধ সন্তানের অভিভাবক হওয়ার দাবি হারায় না।
বৈধ সন্তানের ক্ষেত্রে কোনো হিন্দু বাবা ধর্ম পরিবর্তন করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করলে তার জন্য নাবালক সন্তানের ওপর তার অভিভাবকত্বের অধিকার হারায় না, কারণ বাবার ধর্ম অনুযায়ী সন্তানের ধর্ম নির্ধারিত হয়। কিন্তু মায়ের ক্ষেত্রে এই শর্ত প্রযোজ্য নয়। মা ধর্ম পরিবর্তন করলে আদালত মায়ের হেফাজত হতে নাবালক সন্তানকে অন্য কোনো হিন্দু ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করতে পারে। যদি কোনো নাবালকের মা-বাবা না থাকে এবং আদালত কর্তৃক নিযুক্ত কোনো অভিভাবক না থাকে, তখন সাধারণত নাবালকের পুরুষ আত্মীয় নাবালকের বিষয়াদি দেখাশোনা করে থাকে। বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে হিন্দু আইন প্রযোজ্য।
খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের সন্তানের অভিভাবকত্ব
খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রেও বাবা স্বাভাবিক অভিভাবক। কিন্তু কোনো বিয়ে ভেঙে গেলে সহজ একটি প্রশ্ন উঠে আসে— নাবালক সন্তানের অভিভাবকত্ব কে পাবে? ডিভোর্স অ্যাক্ট ১৮৬৯-তে এ ব্যাপারে কিছু দিক-নির্দেশনা রয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশে প্রচলিত অভিভাবকত্ব-সংক্রান্ত আইন অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রযোজ্য। যেকোনো বিবাহবিচ্ছেদ বা জুডিশিয়াল সেপারেশনের সময় আদালত নাবালকের অভিভাবকত্ব নির্ণয় করে দেন। এ ব্যাপারে আদালতের নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে। তবে সন্তানের কল্যাণ বা মঙ্গল প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলে মাকে অভিভাবকত্বের অধিকার দিলেও মা হয় আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক। যদি মায়ের ধর্মবিশ্বাস ভিন্ন হয়ে যায়, সন্তানকে অবশ্যই তার বাবার ধর্মবিশ্বাসের আলোকে প্রতিপালন করতে হবে। আর যদি মা এই প্রতিপালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে সন্তানের অভিভাবকত্ব হারাতে পারে। আবার আদালত বাবার বাবা অর্থাত্ দাদাকেও অভিভাবকের দায়িত্ব দিতে পারে, যদি মায়ের অর্থনৈতিক অবস্থা সচ্ছল না থাকে।
এখানে সংবিধান অনুসারে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। কিন্তু সন্তানের অভিভাবকত্বের অধিকারের ক্ষেত্রে একজন নারী যে মা, সে সব সময়ই বাবা অর্থাত্ পুরুষের পরে আসে। সুতরাং এ কথা স্পষ্ট যে, বাবার অবর্তমানে, বাবা যদি ক্ষমতা দেয় বা না দেয় তার ওপর নির্ভর করে একজন মায়ের অধিকার।
