মায়ের প্রতি ভালোবাসায় চালক রোকন গ্রেপ্তার!

,ঈদের ছুটি শেষে স্ত্রী পারুল আক্তারকে নিয়ে রোববার ময়মনসিংহের শ্বশুরবাড়ি থেকে আলম এশিয়া পরিবহনের একটি বাসে চড়ে গাজীপুরের বাসায় ফিরছিলেন স্থানীয় স্কটেক্স অ্যাপারেলস পোশাক কারখানার গাড়িচালক সালাহ উদ্দিন (৩৫)।

পথে তাঁর সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ওই বাসের কন্ডাক্টর, হেলপার, সুপারভাইজার ও চালকের বাকবিতণ্ডা হয়।

নিজেকে গাড়িচালক পরিচয় দিয়ে সালাহ উদ্দিন কিছু টাকা কম দিতে চাইলে এ বাকবিতণ্ডা হয়। এ সময় বাসের কন্ডাক্টর ও সহকারীরা সালাহ উদ্দিনকে লাঞ্ছিত করেন এবং হুমকি দেন।

বাসশ্রমিকরা মারধর করতে পারেন এ আশঙ্কায় সালাহ উদ্দিন তাঁর ভাই জামাল উদ্দিনকে মোবাইল ফোনে জানিয়ে গাজীপুরের বাঘেরবাজার বাসস্ট্যান্ডে আসতে বলেন। খবর পেয়ে জামাল উদ্দিন ওই বাসস্ট্যান্ডে এসে ভাই ও ভাবির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

একপর্যায়ে বাসটি বাঘেরবাজার এলাকায় পৌঁছালে বাসের শ্রমিকরা লাথি মেরে সালাহ উদ্দিনকে বাস থেকে নিচে ফেলে দেন। তাঁর স্ত্রীকে না নামিয়ে চালক বাসটি নিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় সালাহ উদ্দিন ও তাঁর ভাই জামাল উদ্দিন গতিরোধের জন্য বাসের সামনে দাঁড়ালে চালক সালাহ উদ্দিনকে চাপা দিয়ে বাসটি নিয়ে পালিয়ে যান। এতে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে সালাহ উদ্দিন ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

পরে সালাহ উদ্দিনের স্ত্রীকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের আমতলা এলাকায় বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।

এ ঘটনার পর বাসটিকে স্থানীয় হোতাপাড়া এলাকার ফুয়াং কারখানার সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ফেলে রেখে বাসের চালক, কন্ডাক্টর, হেলপার ও সুপারভাইজারসহ অন্যরা পালিয়ে যান।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বাসটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় জব্দ করে। এ ঘটনায় রাতে নিহতের ছোট ভাই জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে জয়দেবপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় বাসের চালক, কন্ডাক্টর, হেলপার ও সুপারভাইজারকে আসামি করা হয়।

এরপর বাসচালক রোকন উদ্দিনকে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া থানা সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মায়ের প্রতি ভালোবাসার কারণেই চালক রোকন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে বলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জয়দেবপুর থানার এসআই আবদুর রহমান ভূঁইয়া জানিয়েছেন।

পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পর বাসটিকে গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া এলাকার ফুয়াং কারখানার সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ফেলে রেখে চালক রোকন উদ্দিন ও তাঁর সহকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় রোকন উদ্দিন ভুলক্রমে তাঁর মোবাইল ফোনটি বাসে ফেলে রেখে যান। পুলিশ বাস থেকে মোবাইল ফোন উদ্ধার করে। তবে চালকের নাম পরিচয় অজ্ঞাত থাকে। পুলিশ ময়মনসিংহের বাস টার্মিনাল এলাকা ও তাঁর ভাড়া বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে চালকের সন্ধান করতে থাকে। পরে একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় রোকন উদ্দিনের গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালাতে যায়। এ সময় রোকন তাঁর মাকে নিয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে রোকন পাশের কংস নদীতে ঝাঁপ দেন। এ সময় পুলিশ এলাকাবাসীর সহযোগিতায় নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে রোকনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনার সময় রোকনের মা কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে যান।

এসআই আবদুর রহমান ভূঁইয়া আরো জানান, মায়ের প্রতি ভালোবাসার কারণেই চালক রোকন উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। ঘটনার পর তিনি মাকে সঙ্গে নিয়েই বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। মা তাঁর সঙ্গে থাকার কারণেই বাংলাদেশ সীমান্ত পার হতে বিলম্ব হওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা গেছে। তা না হলে তিনি দালালের মাধ্যমে ঘটনার পর পরই ভারতে পাড়ি জমাতেন।

জয়দেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান ও নিহতের স্ত্রী ও ভাই জামাল উদ্দিন জানান