
মাদকের ঢাকা সিন্ডিকেটের প্রভাবশালী গডফাদার ও মাদক বাজার নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবসায়ীরা রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে। মাদকের স্পটে স্পটে চিরুনি অভিযান চালিয়েও তাদের সন্ধান মিলছে না। এমনকি গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের বাড়িঘরে অভিযান চালিয়েও ব্যর্থ হতে হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ইয়াবা সিন্ডিকেটের শীর্ষ গডফাদার হিসেবে বিতর্কিত আবদুর রহমান বদি ওমরাহ পালনের কথা বলে দেশ ছেড়েছেন। ইয়াবা বাণিজ্যে খুব অল্প সময়ে শত কোটিপতি বনে যাওয়া টোকাই ইশতিয়াক হানিমুনের নামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেশ থেকে দেশে। মাদক সংশ্লিষ্টতায় তালিকাভুক্ত রাজধানীর দুই ওয়ার্ড কাউন্সিলরের একজন থাইল্যান্ড, অন্যজন পাড়ি জমিয়েছেন ভারতে। মাদকবিরোধী অভিযান থামলেই তারা দেশে ফিরবেন বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। অভিযান চলাকালীন সময়ে বিপরীত দৃশ্যপটও রয়েছে। মাদক ডিলার হিসেবে চিহ্নিত আরও শতাধিক প্রভাবশালী নানা কৌশলে রাজধানীতেই বিচরণ করছে। তারা রাজনৈতিক, বৈধ ব্যবসায়িক ও জনপ্রতিনিধির পরিচয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। বহাল তবিয়তে থাকা মাদক দুর্বৃত্তরা প্রশাসনিক সহায়তা পাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। আগারগাঁও এলাকায় কেবলমাত্র থানা পুলিশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েই হাসু বাহিনীর ১৫-২০ জন সদস্য বিশেষ অভিযান থেকে রেহাই পাচ্ছে। গুলিস্তান এলাকাতে ইয়াবা বাণিজ্য এখনো রমরমা। প্রতিদিনই আড্ডার আসর বসছে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকায়। গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকার এক মাদক ব্যবসায়ীর ৩০ জনেরও বেশি সহযোগী নিয়ে বেপরোয়া মাদক বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের একজনের বিরুদ্ধে গুলশান, বনানী, কাফরুলসহ বিভিন্ন থানায় ১৮টি মামলা রয়েছে। অজ্ঞাত কারণে তারা প্রতিবারের মতো এবারও বিশেষ অভিযানমুক্ত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রেখে অধরাই থেকে যাচ্ছেন পশ্চিম নাখালপাড়ার আল আমীন ওরফে মানিক, অপু, মহাখালীর মো. জাকির হোসেন, মো. পলাশ। মানিক এবং পলাশ ক্ষমতাসীন একটি দলের যুব সংগঠনের নেতা হওয়ায় প্রশাসন থেকেও পাচ্ছেন বিশেষ সুবিধা।
এদিকে মাদকের রাঘব-বোয়ালদের ধরা না গেলেও ‘মাদকবিরোধীদের’ গ্রেফতার করে হাজতে পাঠানোর নানা নজির দেখা গেছে। খিলগাঁও থানা এলাকায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মাদকবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলায় হামলা, মামলাসহ অসংখ্য মামলার শিকার আবদুল আজিজকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে আট দিন পর মাদক মামলা দিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে। এ ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে মাদকবিরোধী যুদ্ধ অভিযানও। বিশেষ অভিযানকালে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের সন্ধান না মিললেও মাদকের সাপ্লাই বয় ও ভাসমান ক্রেতারা কেউ রেহাই পাচ্ছেন না। কারফিউর আদলে ব্লক রেইড দিয়ে ঘরে ঘরে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার হচ্ছে, গ্রেফতার হচ্ছে সেলসম্যানসহ মাদকসেবীরা। এ অভিযানের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে মাদক গডফাদাররা। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগসূত্র ও অর্থবিত্তের জোরে অনায়াসেই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। অভিযানে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা জানান, মাদক গডফাদারের অনেকেই সমাজপতি, কেউ কেউ আবার মাঠপর্যায়ের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য পরিবহন মালিক। এদের এক যুগ আগে-পরের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে খোদ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর কর্মকর্তারাও অবাক বনে যান। ইতিমধ্যেই মাদক বাণিজ্যে টাকার কুমির হয়ে ওঠা বেশ কয়েকজন ইয়াবা গডফাদারের তথ্য-উপাত্ত দুর্নীতি দমন কমিশনে দাখিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। দুদক গোপন অনুসন্ধানের পর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগ উত্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে।
গডমাদাররাও বহাল তবিয়তে : শুধু গডফাদার নয়, গডমাদাররাও থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজধানীতে ৭০ সম্রাজ্ঞীর মাদক বাণিজ্যের সুবিশাল নেটওয়ার্ক বছরের পর বছর ধরে সচল রয়েছে। প্রশাসনের সর্বশেষ তালিকায় ২৫ জন নারী মাদক ব্যবসায়িকে অপ্রতিরোধ্য প্রভাবশালী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মাদক চক্রের গডমাদাররা হচ্ছে, সবুজবাগের সুফিয়া আক্তার শোভা (৫০), শামসুন্নাহার চম্পা, সবুজবাগ এলাকার তানিয়া বেগম, গেন্ডারিয়ার রহিমা, সায়েদাবাদ ওয়াসা কলোনির গডমাদার সুফিয়া আক্তার সুফি (৪৫), কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় জমিলা খাতুন, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ফারহানা আক্তার পাপিয়া। ভাসানটেক বস্তিতে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী মোর্শেদা, রূপনগর দুয়ারীপাড়ায় সালেহা বেগম, কামরাঙ্গীরচরে শাহিনুর রহমান, কারওয়ান বাজার শিল্পী ও আকলিমা আক্তার, কাফরুলে জ্যোত্স্না বেগম, ভাসানটেকের ধামালকোট এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছে স্বপ্না। ঢাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ইশতিয়াকের স্ত্রী পাখি বেগম, আসমা আহমেদ ডালিয়া, আনোয়ারা বেগম আনু, নার্গিস, কুট্টি, মিনা বেগম ও মাহমুদা খাতুন। তাদের বিরুদ্ধে ৭ থেকে ২৩টি পর্যন্ত মাদক মামলা রয়েছে। কক্সবাজারে ‘বড় আম্মা’ খ্যাত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী আয়েশা বেগম এখন ঢাকায় বসেই তার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে চলছেন।
অভিযান শেষ হতেই সচল মাদক আখড়া : মাদকবিরোধী চলমান সাঁড়াশি অভিযানে সর্বত্র আতঙ্ক ছড়ালেও মাদক আখড়াগুলো বন্ধ হচ্ছে না মোটেও। অভিযানে ফেনসিডিল, বিয়ার, গাঁজার বাজারে কিছুটা মন্দাভাব নেমে এলেও থামছে না ‘ইয়াবার দৌরাত্ম্য’। বরং অভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আবার সচল হয়ে উঠছে মাদকের কেনাবেচা। মাদকের পাইকারি-খুচরা ব্যবসায়ীসহ তাদের সার্ভিস বয়রা পর্যন্ত গা ঢাকা দিয়েছে। কিন্তু নতুন মুখের সার্ভিস বয়দের মাধ্যমে ইয়াবাসেবীদের কাছে ঠিকই সরবরাহ পৌঁছে যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক অভিযানের ধকল সামাল দেওয়ার নামে প্রতি পিস ইয়াবার খুচরা বিক্রয়মূল্য ৫০ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে বিভিন্ন পয়েন্টে ‘কারফিউর আদলে’ ঘেরাও দিয়ে ৩-৪ ঘণ্টাব্যাপী অভিযানকালে মূলত মাদকসেবী খদ্দের ও ভাসমান মানুষজনই বেশি গ্রেফতার হচ্ছে। বেশিরভাগ মাদক ব্যবসায়ী ধরপাকড় এড়িয়ে অভিযানের পর পরই আবার তারা স্পটগুলো সচল করতে সক্ষম হচ্ছে। অভিযানস্থলে নজরদারি বহাল না থাকায় সেসব স্থানে মাদক বেচাকেনা আরও নির্বিঘ্ন হয়েছে—বলা হচ্ছে, ‘এ বস্তিতে বিশেষ অভিযান হয়ে গেছে, আর হবে না কিছুই।’ মঙ্গলবার মধ্যরাতে রাজধানীর ভাসানটেক এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে র্যাব সদস্যদের বন্দুকযুদ্ধ এবং মঙ্গলবার দিনব্যাপী মিরপুর, পল্লবী ও রূপনগর থানায় পুলিশের অভিযান পয়েন্টের বস্তিগুলোতে সরেজমিনে গিয়ে এ পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সোমবার মিরপুরের শাহআলী থানার ঝিলপাড় এলাকায় কয়েকশ পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের পর রাতেই সেখানে মাদক ক্রেতাদের ভিড় জমে ওঠে। একই দিন ডিবির অভিযানে রূপনগর থানার চলন্তিকা বস্তির মাদক সম্রাট নজরুল ইসলাম নজু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে ওই বস্তির মাদক বাণিজ্য চার ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ভোর ৬টার দিকেই বস্তির গলিপথে জড়ো হওয়া শত শত মাদকসেবীকে লাইনে দাঁড় করিয়ে প্রকাশ্যে ইয়াবা ফেনসিডিলের সরবরাহ দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
