মাথা নিয়ে মাতামাতি

ছোটবেলা থেকে আমার বাবা-মা আমাকে মাছের মাথা খাওয়াতেন। খেতে না চাইলেও জোর করে খাওয়াতেন। এভাবে একসময় মাছের মাথা আমার খুব প্রিয় হয়ে ওঠে। তারপর থেকে বাসায় যত বড় মাছ-ই রান্না করা হোক না কেন মাথাটা আমার জন্য রাখা হতো। আমি বাবাকে তুলে দিলেও উনি খেতেন না, বলতেন, ‘তুমি খাও। তোমার মাথা খাওয়ার দরকার আছে।’

এভাবে মাছ, হাঁস, মুরগি, কবুতর—সবকিছুর মাথা আমাকেই খাওয়াত। গরু-ছাগলের ঘিলু ভুনা করে খাওয়াত।

কারণ আমার বাবা-মায়ের ধারণা মাথা খেলে মাথা (ব্রেইন) হয়। তাদের এ ধারণার ফলে সারাজীবন এত এত মাথা খেয়েছি, তাতে যে মাথা হয়েছে, সেটা ঘাড়ের উপর দণ্ডায়মান দেখতে শুনতে মাথা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কোনো কাজের মাথা হয়নি। মানে ব্রেইন হয়নি।

এখন হয়তো আমার বাবা-মায়ের ধারণা পাল্টে গেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, এতদিন ধরে আমাকে মাথা খাওয়ানোয় তাদের কোনো উপকারে আসেনি। না কাজে এসেছে বিদ্যায়, না বুদ্ধিতে।

এই তো সেদিন মাছের মাথা নিয়ে খেতে বসেছি, বাবা তো বলেই ফেললেন, ‘খাও মা খাও, আরও বেশি করে মাথা খাও!’

বলে তিনি হাসছেন। তার হাসিতে তিনি স্পষ্ট অর্থে বুঝাতে চাইলেন আমাকে মাছের মাথা খাওয়ানো তাদের বৃথা চেষ্টা ছিল।

তারা কেন বোঝে না চর্বির তৈরি, তুলতুলে, স্পর্শকাতর, স্পঞ্জের ন্যায় ওই অংশটি (মস্তিষ্ক) সবার সমান হয় না।

তারা কেন বোঝে না ‘সেরেব্রাল কর্টেক্স’, যেটার কারণে মানুষের বুদ্ধি হয়, পড়ালেখায় প্রখর হয়, সেটার গঠন হয়তো আমার ক্ষেত্রে উন্নত নয়। তারা কেন বোঝে না, আমাকে নিয়ে তাদের কোনো কিছুই আশা করা উচিত নয়। তারা কেন বোঝে না, অন্যদের দেখিয়ে দিয়ে তাদের মতো হতে বলা ঠিক নয়। তারা কেন বোঝে না, নিউরন যার প্রতিটি সংযোগ এক বিট তথ্য সংগ্রহ করে, আমার নিউরন হয়তো উন্নত নয়, ১০০০ বিলিয়ন নয়। তারা কেন বোঝে না, কেন, কেন, কেন?

তবে আমি মনে করি, আমার ফ্রন্টাল লোব বেশ সক্রিয়। যেটা দিয়ে আমি মস্তিষ্ক কর্তৃক প্রেরিত ভবিষ্যত্ অশুভ ঘটনাগুলো এড়িয়ে যেতে পারি। অর্থাত্ মস্তিষ্ক যদি সাড়া দেয় আমার ভবিষ্যদ্বাণী হলো ‘অশুভ’। তখন আমার ফ্রন্টাল লোব সক্রিয় হয়ে বার্তা প্রেরণ করে, ‘ভবিষ্যত্ ভেবে বর্তমান হারাম করার কোনো মানে হয় না।’ তখন আমি আবার নিজেই মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে ঘিলুকে (মস্তিষ্ক) বার্তা প্রেরণ করি, ‘আমার করার কিছু নাই, যা কিছু আছে সব সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি।’

আর মাথা খাইয়ে খাইয়ে মাথা বানানোর প্রক্রিয়া বাবা-মায়ের মাথামোটা কাণ্ড। তা না হলে কেউ এভাবে মাথাগিরি করে?

রাজারহাট, কুড়িগ্রাম।