মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ ও প্রভাব বলয়

সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ককে এক ধাপ এগিয়ে নিতে আরব রাষ্ট্রগুলোকে ২৩ বিলিয়ন ডলার সাহায্য ও অনুদান দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বেইজিং আরব লীগের ২২টি দেশের সঙ্গেও মুক্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে পরীক্ষা করে দেখতে ইচ্ছুক। বিশ্বায়নের প্রতি শি-এর অঙ্গীকারপ্রসূত এ সব উদ্যোগ এমন একটি সময়ে সামনে এসেছে যখন চীন ইতোমধ্যেই আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্টের ভাষ্য মতে, বেইজিং আরব দেশগুলোর সার্বভৌম তহবিলের সাথে একসঙ্গে হাইড্রোকার্বন ও নবায়নযোগ্য শক্তি উত্পাদনের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়াতে চায়। সেজন্যও ৩ বিলিয়ন ডলার বিশেষ অনুদান বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যে এত এত বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন আসলে কী চাইছে?

বেইজিং এ অনুষ্ঠিত চীন-আরব কো-অপারেশন ফোরামের একটি আলোচনায় প্রেসিডেন্ট শি তার মন্ত্রী ও নেতৃবৃন্দকে বলেন, আরব লীগ (যা মূলত উত্তর আফ্রিকার অন্তর্গত রাষ্ট্রসমূহ, ইথিওপিয়ার অংশবিশেষ, সোমালিয়া এবং আরব রাষ্ট্রসমূহের একটি আঞ্চলিক জোট) ভবিষ্যতের স্বার্থে ব্যাপক সহযোগিতাভিত্তিক, সম্মিলিত উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। চীনও তেমনি আরব দেশগুলোর সঙ্গে একসাথে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলার এবং সাম্য ও ন্যায়বিচার রক্ষায় সহযোগী হয়ে কাজ করতে চায়। এ অঞ্চলে চীনের সর্বশেষ অনুদান প্রদানের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলার; যা দেশগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্প ব্যয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে ব্যবহূত হবে। এ ছাড়া আরো প্রায় ৯১ বিলিয়ন ডলার সাহায্য মানবকল্যাণ ও পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া, ইয়েমেন, জর্ডান এবং লেবাননকে প্রদান করা হবে। অঞ্চলটির সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য আরো ১ বিলিয়ন ইউয়ান প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, চীনের সাম্প্রতিক এ সব তত্পরতা থেকে এটাই প্রতীয়মান যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ভূ-কৌশলগত দিক থেকে নিজের অবস্থানকে ক্রমশ সুদৃঢ় করতে চায় চীন, যা কয়েক বছর আগে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অনুমোদনকৃত ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর একটি মূল অংশ। এর উদ্দেশ্য বিভিন্ন বন্দর, রেলওয়ে, রাস্তা ও শিল্প পার্কের মাধ্যমে আফ্রিকা ও চীনের মাঝে একটি যোগসূত্র তৈরি করা। এই্ ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় মধ্যপ্রাচ্য এবং পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল তথা দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য চীনের পররাষ্ট্র নীতির মূলকেন্দ্রে অবস্থান করছে। অনেকে এও বলেন, চীনের নতুন সিল্ক রোডের মূল লক্ষ্য আসলে বিত্তশালী ইউরোপীয় বাজারের চেয়েও মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ।

২০১০ সাল থেকে অঞ্চলটির বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার আমেরিকার স্থান দখল করে বেইজিং আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছে। আর এ সম্পর্ক চীনের জ্বালানি চাহিদার ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। এ ছাড়া অঞ্চলটির প্রাকৃতিক গ্যাসেরও বড় আমদানিকারক চীন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের বাজারে রপ্তানিও ধীরে ধীরে বাড়ছে বড় বড় বিনিয়োগ সরবরাহের বিনিময়ে। অপরিশোধিত তেল আর প্রাকৃতিক গ্যাসের রপ্তানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি উত্পাদনকারী বৃহত্ দেশগুলোর চীনের ওপর নির্ভরশীলতা ২০০১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে অঞ্চলটির ওপর চীনের নির্ভরশীলতা ক্রমশ কমছে, প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে হলেও বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং তেলভিত্তিক চুক্তিগুলোতে পছন্দসই নিজের অগ্রাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে বেশ লাভবান হতে পারে চীন।

তবে বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলটি নিয়ে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক উচ্চাশার হিতে বিপরীত ফল হতে পারে। তেল সরবরাহে কিংবা বাণিজ্যপথে যে কোনো অপ্রত্যাশিত বাধায় চীনের জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচের দেশগুলোর কাছে যেকোনো জটিল ও গভীর সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে পরস্পরের সার্বভৌমত্বকে শ্রদ্ধা করবার আবেদন জানিয়েছেন। বেইজিংয়ের ইউনিভার্সিটি অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এন্ড ইকোনমিকসের অধ্যাপক ডিং লং এর মতে, এ অঞ্চলে চীন আরো বড় ভূমিকা পালন করতে পারবে। মধ্যপ্রাচ্যে অন্যান্য যেসব শক্তির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে তাদের তুলনায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন বড় ভূমিকা পালন করতে সক্ষম; যা থেকে শিল্পের পুনর্গঠন ও বৈচিত্র্য আনয়নে আগ্রহী দেশগুলো লাভবান হতে পারে।

বেইজিং দীর্ঘদিন থেকেই নানা সমস্যায় জর্জরিত অঞ্চলটিতে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রধান সমাধান হিসেবে ব্যাখ্যা করে আসছে। তবে অনেকেই বলছেন, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে ছাড়িয়ে চিন্তা করা উচিত বেইজিংয়ের। কেননা বারাক ওবামা ২০১৪ সালে বেইজিংকে ‘ফ্রি রাইডার’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন যে শুধু অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে চাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাদের কোনো উদ্যোগ নেই।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ইস্যু থেকে চীনের নিরাপদ দূরত্বে থাকা প্রসঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জুস্ট হিল্টারম্যান বলেন, এ অঞ্চলটিতে রাজনৈতিক কোনো কিছুতে না জড়িয়ে শুধু অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করেও চীনের অর্জনের খাতা মোটেই শূন্য নয়, তবে রাজনীতিকে একেবারে একপাশে সরিয়ে রাখাও বেশি দিন সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে এখানে রাজনীতিতে জড়ানোর বিষয়টি চীনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ওপর মোটেই নির্ভর করবে না, বিশেষ করে যদি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা শূন্যতা তার বাণিজ্যিক স্বার্থ ও বিনিয়োগের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। হিল্টারম্যান বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি চীনের জন্য ভীষণ রকম চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াতে পারে; কারণ তা একদিকে যেমন তাকে জটিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে অন্যদিকে বন্ধুত্বের পাশাপাশি শত্রুতারও জন্ম দেবে।

চীনের উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে যতো বাড়বে, সেখানে তার বিনিয়োগ কোথায় হবে, কার সাথে বাণিজ্য হবে এ সব কিছুতেই ততবেশি রাজনীতিকরণ হবে। বাহ্যত, বিষয়টিকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ক্ষমতাধর উচ্চাকাঙ্ক্ষী চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর স্বাগত জানানো উচিত; যারা দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে আমেরিকা এবং রাশিয়ার বিকল্প খুঁজছিল। যদিও চীনের কূটনৈতিক চিন্তা ভাবনা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের খুব বেশি মাথাব্যথা নেই, তবু মনে রাখা প্রয়োজন, অন্য বড় শক্তিগুলোর মতো কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই অযাচিত এবং অপ্রত্যাশিতভাবে এখানকার গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো ঘটনার ওপর প্রভাব বিস্তার করা চীনের পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। মধ্যপ্রাচ্যের মতো বিপজ্জনক একটি অঞ্চলে বিনিয়োগের সমূহ বিপদ সম্পর্কে চীন ক্রমেই অবগত হচ্ছে। সেই সাথে কঠোর সামরিক শক্তি প্রয়োগ ছাড়া অন্য কোনো ভাষা যেসব দেশের নেই, হোক সেই শক্তি তাদের নিজস্ব কিংবা আমেরিকা বা রাশিয়ার সহযোগিতায় প্রাপ্ত, তাদের সঙ্গেও কাজের জটিলতা চীনের অজানা নেই। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চীনকে নিয়ে কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার অভাব অঞ্চলটির একটি দুর্বলতাই বলতে হবে। তারা তাদের এমন একজন অংশীদারকে চোখের আড়ালে রেখে দিচ্ছে যে অন্যান্য পরাশক্তির মতো তাদের অঞ্চলে সামরিকভাবে উপস্থিত হতে চায় না; তথাপি তাদের অনাগত ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি প্রভাব প্রদর্শনের সক্ষমতা রাখে। এমতাবস্থায়, দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির এ বিচ্যুতি কতদিন স্থায়ী হয় আর তা থেকে চীন এবং মধ্যপ্রাচ্য উভয়ের স্বার্থ কতটা অক্ষুণ্ন থাকে সেটিই এখন দেখার বিষয়।