১৯৮৩ বিশ্বকাপ জিতেছেন রবি শাস্ত্রী। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ফাইনালে হারিয়ে লর্ডসে ভারতের শিরোপা জয়টা ছিল রূপকথা। ২০১১ সালে ভারত নিজেদের মাটিতে জেতে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। সেই দলের অন্যতম সদস্য বিরাট কোহলি এখন ভারতের অধিনায়ক। রবি শাস্ত্রী কোচ। দুজনের হাত ধরে অস্ট্রেলিয়ায় নতুন ইতিহাস ভারতের। ৭১ বছর আর ১২তম সফরে এসে প্রথমবার টেস্ট সিরিজ জিতল ২-১ ব্যবধানে। সে ব্যবধান আরো বাড়তে পারত। কিন্তু বৃষ্টিতে সিডনি টেস্টের পঞ্চম দিন কোনো বল গড়ায়নি মাঠে। ড্র মেনে নেয় দুই দল। জয় হাত ফসকে গেলেও সিরিজ নিশ্চিত করায় আবেগী হয়ে পড়েছেন শাস্ত্রী-কোহলি। বিশ্বকাপের চেয়েও এই সিরিজ জেতাটাকে এগিয়ে রাখছেন দুজন। ভারতীয় সাবেক ক্রিকেটার, বলিউড তারকা, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও শুভেচ্ছায় সিক্ত করেছেন দলকে। কোহলির স্ত্রী বলিউড নায়িকা আনুশকা শর্মা তো মাঠে নেমেই আলিঙ্গন করেছেন ভারতীয় অধিনায়ককে। আর সতীর্থরা ঐতিহাসিক জয় উদ্যাপন করেন সিরিজ সেরা চেতেশ্বর পূজারাকে মাঠে নাচিয়ে!

২০১১ বিশ্বকাপের চেয়ে এবার বেশি আবেগী হওয়ার কারণটা বিরাট কোহলি ব্যাখ্যা করলেন সংবাদ সম্মেলনে, ‘২০১১ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলে আমিই ছিলাম সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়। আমার চারপাশের মানুষগুলোকে অদ্ভুত আবেগী হতে দেখেছিলাম। কিন্তু আমি সেটা সেভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি। কারণ বিশ্বকাপ খেলছিলাম প্রথমবার আর সেটা দেশের মাটিতে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় এবার এসেছি তৃতীয় সফরে। এত দিন ভারতীয় দল যা পারেনি আমরা সেটাই করে দেখিয়েছি। আমার ক্যারিয়ারের সেরা সাফল্য এটাই।’
রবি শাস্ত্রী গত ইংল্যান্ড সফরের সময় বলেছিলেন বিদেশের মাটিতে ভারতের এই দলটাই সেরা। কিন্তু সিরিজের ব্যর্থতায় সমালোচনা হয় শাস্ত্রীকে ঘিরে। তবে ক্রিকেটারদের ওপর আস্থা হারাননি কখনো। সেই দলটার প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতাটা তাঁর কাছে তাই ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয়ের চেয়েও বেশি কিছু, ‘এমন জয়ে ভীষণ খুশি আমি। ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ বা এর দুই বছর পরের ওয়ার্ল্ড সিরিজ জয়ের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে এটা। আমি বরং বলব সেই ট্রফিগুলোর চেয়েও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ জেতা বেশি কৃতিত্বের। কারণ কোহলিরা বাজিমাত করেছে ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদার ফরম্যাট টেস্টে।’
স্টিভেন স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার, ক্যামেরন ব্যানক্রফটারা নিষিদ্ধ থাকায় ভারতের সেরা সুযোগ দেখছিলেন বিশেষজ্ঞরা। সিরিজজুড়ে এই ত্রয়ীর জন্য আকুতি করে গেছেন অধিনায়ক টিম পাইন ও কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার। তবে গতকাল সিরিজ হারের পর পাইন শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিলেন ভারতের, ‘টুপি খুলে সম্মান জানাচ্ছি ভারতকে। ওদের দেশে গিয়ে প্রচণ্ড গরমে মানিয়ে সেরাটা খেলা কঠিন। একইভাবে কঠিন অস্ট্রেলিয়া এসে খেলাটাও। এখানে সিরিজ জেতা মোটেও সহজ নয়। যোগ্য দল হিসেবে এবার জিতেছে ওরা। কোহলি, শাস্ত্রীদের অভিনন্দন।’
টেস্ট র্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল অস্ট্রেলিয়ান দুর্গ জয়। সেটা করতে পারায় গর্বিত কোহলি, ‘এমন সাফল্যে আমরা গর্বিত। এই জয় আমাদের দলকে নতুন পরিচয় এনে দেবে। এই কীর্তির পুনরাবৃত্তিতে ভারতীয় ক্রিকেটের তরুণ প্রজন্মকে ফলটা বাড়তি উৎসাহ দেবে।’ ম্যাচ ও সিরিজ সেরার স্বীকৃতি যথারীতি চেতেশ্বর পূজারার। সিরিজে তিন তিনটি সেঞ্চুরি করেছেন তিনি, এর আগে যা ভারতীয়দের মধ্যে পেরেছিলেন শুধু সুনীল গাভাস্কার। এ জন্যই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরুর আগে অদ্ভুত মুদ্রায় মাঠে পূজারাকে রীতিমতো নাচিয়ে ছাড়েন ঋষভ পান্ট। সেই সঙ্গে নেচে ওঠে পুরো দলও। সময়টাই যে এখন তাদের। পিটিআই
কোহলিই প্রথম
শুধু কি ভারত? এশিয়ার কোনো দলেরই অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে টেস্ট সিরিজ জিতে আসার কীর্তি ছিল না এত দিন। টেস্ট ম্যাচ অনেকে জিতলেও বিরাট কোহলিই প্রথম জিতলেন সিরিজ। এশিয়ান দলগুলোর মধ্যে এর আগের ২৮ অধিনায়ক যা পারেননি তাই করলেন কোহলি। ২৯তম অধিনায়ক হিসেবে জিতলেন সিরিজ। এশিয়ার দলগুলো মোট ৩১ বার টেস্ট সিরিজ খেলতে এসেছে অস্ট্রেলিয়ায়। মোট টেস্ট খেলেছে ৯৮টি। তাতে জয় মাত্র ১১ টেস্টে, হার ৬৬টিতে। ভারত এর আগে ১১ বার অস্ট্রেলিয়া এসে সিরিজ ড্র করেছিল তিনবার। সবশেষ ২০০৩-০৪ মৌসুমে ড্র করেছিল সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বে। ভারত ছাড়া ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকা আর নিউজিল্যান্ডের কৃতিত্ব আছে অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ জেতার। অস্ট্রেলিয়া-ভারতের সিরিজের নাম এখন বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি। তবে প্রথমবার সিরিজ জিতলেও গাভাস্কার মাঠে উপস্থিত থেকে ট্রফিটা দিতে পারেননি কোহলিকে। কারণ অস্ট্রেলিয়ান বোর্ডের নতুন কর্তারা আমন্ত্রণই জানাননি তাঁকে! ধারাভাষ্যকক্ষে কোহলিদের উদ্যাপন দেখে শুধু বলছিলেন, ‘চোখ ভিজে গেল!’ পিটিআই সূত্র: কালের কন্ঠ
