ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ ছিলো তানভীর হাসান সোহাগের। ছোটবেলায় টিভিতে বাংলাদেশের খেলা দেখতেন তিনি। বাংলাদেশের খেলাই তাকে ক্রিকেটের প্রতি আকর্ষিত করে। ধীরে ধীরে ক্রিকেটের প্রতি তার আকর্ষণ বাড়তে থাকে।
একটা সময় সেই আকর্ষণটা একজন ক্রিকেটার হবার স্বপ্নে পরিণত হয়। প্রথম পর্যায়ে পরিবার থেকে তেমন সমর্থন পাননি তানভীর। একটা সময় ক্লাস ফাঁকি দিয়ে খেলতে হয়েছিলো তাকে। খেলার জন্য অনেকবার বাবার কাছে মারও খেতে হয়েছিলো তানভীরকে। কিন্তু তাতে তিনি থেমে থাকেন নি। বরং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে লড়ে গেছেন, এখনো লড়ে যাচ্ছেন।
প্রতিভাবান এই লেগ স্পিনার ২০১০ সালে ক্রিকেটার হবার স্বপ্ন নিয়ে যান ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ডে। পড়াশোনার পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন তিনি। তবে ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত খেলছেন ইংলিশ ক্লাব চিংফোর্ডের হয়ে। এই লেগ স্পিনার ইতোমধ্যেই জিম্বাবুয়ে ও পাকিস্তান ব্যতীত মোটামুটি সবদলের নেট বোলার হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন।
তার বলে নিজেদের ঝালিয়ে নিয়েছেন নামিদামি সব খেলোয়াড়রা। সম্প্রতি ইংল্যান্ড লায়নস ও ইন্ডিয়া ‘এ’ দলের এবং ইংল্যান্ড ও ইন্ডিয়ার জাতীয় টেস্ট দলের নেট বোলার হিসেবে বোলিং করেছেন এই বাংলাদেশি লেগ স্পিনার। চিংফোর্ডের হয়ে সর্বশেষ সিজনে ১৮ ম্যাচে ৪৯ টি উইকেট ও ৩০.২২ এভারেজে ২৭২ রান করেছেন তিনি। এ ছাড়াও কিউ ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে ১৯ ম্যাচে ৩৮ উইকেট নিয়েছেন তিনি।
এই তরুণ লেগ স্পিনার প্রতিটা মুহূর্তেই নিজেকে আরো প্রস্তুত করেই চলেছেন। যদিও তিনি এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলতে প্রস্তুত। তার লক্ষ্য বিপিএলে খেলা এবং বাংলাদেশের হয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে আলো ছড়ানো। যেখানে একজন লেগ স্পিনারের অভাবটা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধরনের সমস্যা, সেখানে তানভির বাংলাদেশের জন্য হয়ে ওঠতে পারেন ‘তুরুপের তাস’।
সম্প্রতি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এই তরুণ স্পিনার। সেখানে তিনি বলেছেন তার নানান অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা। তার সাক্ষাৎকারটি নিচে তুলে ধরা হলো:-
আপনার ক্রিকেটার হবার ইচ্ছাটা কবে থেকে?
তানভীর হাসান সোহাগ : ছোটবেলা থেকেই আমি ক্রিকেট পাগল ছিলাম। তখন টিভিতে অনেক বাংলাদেশের খেলা দেখতাম। সে সময় থেকে আমার খেলার প্রতি আগ্রহ বাড়ে আর তখন থেকেই আমার ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা জাগে। স্কুল জীবন থেকে আমার ক্রিকেটার হওয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
ক্রিকেটার হয়ে উঠার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে কেমন সমর্থন পেয়েছেন?
তানভীর হাসান সোহাগ: না পরিবারের কোনো সমর্থন কোনোদিনই পাইনি। স্কুল পালিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। অনেকবার তো ক্রিকেট খেলার জন্য বাবার হাতে মার খেয়েছি।
এই পর্যন্ত ক্রিকেটে উঠে এসেছি আমার নিজের চেষ্টায়। কিন্তু আমার কিছু আমার কিছু কিছু বন্ধুরা সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছে এমকি এখনো করে যাচ্ছে। তারা সবসময়ই আমাকে বলেছে, ” Never Give Up.” ( হাল ছেড়ো না। )
এখনকার প্রেক্ষাপটে পরিবারের কাছ থেকে কেমন সমর্থন পাচ্ছেন?
তানভীর হাসান সোহাগ : হ্যাঁ, এখনকার প্রেক্ষাপটে পরিবারের সাপোর্ট পাচ্ছি। কিন্তু আমার বাবা এখনো বুঝছেন না যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সুযোগ পাওয়াটা একজন ক্লাব ক্রিকেটারের জন্য কতোটা কঠিন! যদিও আমার বিশ্বাস, আমার এখন সেই সামর্থ্যটা আছে।
কিন্তু আমার প্যারেন্টসরা (অভিভাবকরা) সেটা বুঝতে পারছেন না। তারা সবসময়ই বলছেন যখন আমি বাংলাদেশে বা বিপিএলে বা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সুযোগ পাবো, তখনই তারা মেনে নেবেন।
ইংল্যান্ডে যাওয়াটা কবে হলো আর ইংলিশ ক্লাবে ঠিক কবে সুযোগ পেলেন?
তানভীর হাসান সোহাগ : আমি ইংল্যান্ডে এসেছি ২০১০ সালে। তারপর থেকেই আমি অনেক ক্লাবে খেলেছি। কিন্তু, ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ইংলিশ ক্লাব চিংফোর্ডের হয়ে খেলছি।
ইংল্যান্ডে কি আপনার শুধুই ক্রিকেটের জন্যই যাওয়া?
তানভীর : ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করার জন্য এসেছি কিন্তু পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রিকেটাও চালিয়ে যাচ্ছি।
ক্লাবে আপনার লাস্ট সিজনটা কেমন কাটলো? কত রান করেছেন এবং কত উইকেট নিলেন?
তানভীর : লাস্ট সিজন ভালোই গিয়েছে। আমি কিউ ক্লাবে হয়ে ১৯ ম্যাচে ৩৮ উইকেট নিয়েছি আর রবিবারগুলোতে চিংফোর্ড ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে ১৮ ম্যাচে ৪৯ উইকেট নিয়েছি এবং ৩০.২২ এভারেজে ২৭২ রান করেছি।
যুবরাজ সিং, জাসপ্রিত বুমরাসহ তারকা ক্রিকেটাররাও আপনার বলে নিজেদের ঝালিয়ে নিয়েছেন, তাদেরকে বল করার সময় কেমন লাগছিলো?
তানভীর : শুধুমাত্র যুবরাজ কিংবা বুমরাকে আমি বল করিনি। আমি অধিকাংশ ইন্ডিয়ান প্লেয়ারদের এবং জিম্বাবুয়ে ও পাকিস্তান ছাড়া সব দলের নেট বোলার হিসেবে সুযোগ পেয়েছি। রিসেন্টলি ইংল্যান্ড লায়নস এবং ইন্ডিয়া ‘এ’ দলের নেট বলার ছিলাম।
এ ছাড়াও ইংল্যান্ড ও ইন্ডিয়ার জাতীয় টেস্ট দলের নেট বোলার ছিলাম এবং এটা আমার জন্য অনেক বড় ধরনের অভিজ্ঞতা ছিলো। আমি অনেক ভাগ্যবান যে এতো বড় বড় প্লেয়ারদের সাথে ট্রেনিং করেছি আর তাদের প্রতি আমার মনে যে ভয়টা ছিলো, সেটা কেটে গিয়েছে। এ ছাড়া আদিল রশিদ, ইমরান তাহির, সাকিন মোস্তাক, ইস সোদি, অ্যাডম জাম্পার মতো বড় তারকাদের কাছ থেকে টিপস পেয়েছি যেটা আমার ফিউচার ক্রিকেটে অনেক হেল্প করবে বলে আশা করছি।
লেগ স্পিনের ক্ষেত্রে আপনি কাকে আদর্শ মনে করেন?
তানভির : শের্ন ওয়ার্নকে আদর্শ মনে করি কিন্তু আমি বেশিরভাগ লেগ স্পিনারকে ফলো করি। এখন যেমন আদিল রশিদ, ইমরান তাহির ও রশিদ খানকে।
ক্রিকেট নিয়ে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?
তানভীর : ক্রিকেট নিয়ে পরিকল্পনা বলতে সব ক্রিকেটারের ইচ্ছা একটাই, উঁচু লেভেলে খেলা। আমারো তাই। আমি বাংলাদেশি ডমিস্টিক (ঘরোয়া) লিগ যেমন বিপিএল, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলতে চাই। তারপর পারফর্ম করে ন্যাশনাল টিমে খেলতে চাই।
আর মাত্র কিছুদিন পরই বিপিএলের প্লেয়ার ড্রাফট শুরু হচ্ছে। বিপিএলে এবার আপনার খেলার সম্ভাবনা কতটুকু?
তানভীর : বিপিএলে আমার খেলার সম্ভাবনা বলতে গেলে ০% ( জিরো পার্সেন্ট)। কারণ আমাকে বাংলাদেশের কেউ চিনে না, যদিও আমার এখন সেই সক্ষমতা আছে। ইংল্যান্ডে এখন আমার সিজন শেষ। আমি এখন প্রতিদিন ট্রেনিং করছি পরবর্তি সিজনের জন্য নিজেকে তৈরি করতে। যাতে যখনই আমি কোনো সুযোগ পাবো, আমি নিজেকে প্রস্তুত পেতে পারি। আমি যদি বিপিএলে সুযোগ পাই আমি ইনশাল্লাহ ভালো করবো। ইংল্যান্ডের এই অভিজ্ঞতাগুলো কাজে দিবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
আপনি একজন লেগ স্পিনার। বাংলাদেশ এখনো একজন লেগির অভাবে আছে। আপনি লাল-সবুজের জার্সিতে খেলার সুযোগ পেলে সেটা কিভাবে কাজে লাগাতে চান…
তানভীর : বাংলাদেশ টিমে খেলার স্বপ্ন এখনি দেখছি না। আমি জানি আমাকে ডমেস্টিক লিগে খেলেই পাইপলাইনে আসতে হবে । তারপর জাতীয় দলের জন্য বাছাইয়ে আসতে হবে আর পাইপলাইনে আসার জন্য আমাকে বাংলাদেশের ডমেস্টিক লিগগুলোতে খেলতে হবে। আমি মনে করি বিপিএল তেমন একটি প্ল্যাটফর্ম। তাই আমার পরবর্তি লক্ষ্য বিপিএলে খেলা অথবা ডমেস্টিক লিগে। তারপর দেখা যাবে কি হয়, ইনশাল্লাহ।
অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
তানভীর : কঠোর পরিশ্রমের জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ।–স্পোর্টসজোন
