বৈশ্বিক উন্নয়নের সাথে সাথে বাংলাদেশও এগিয়ে চলেছে। দিন যত যাচ্ছে উন্নয়নের ধারণাও আস্তে আস্তে পাল্টে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রাইভেট টিউশনিই ছিল শিক্ষার্থীদের বাড়তি আয়ের একমাত্র উপায় কিন্তু এখন এ ধারণা অনেকখানিই পাল্টে গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে তবেই চাকরি পাওয়া যায়, এমন ধারণা মিথ্যা করে দিচ্ছে বর্তমান যুগের নারী শিক্ষার্থীরা। এমন অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে যারা শুধু নিজেদের শিক্ষা জীবনেই এগিয়ে যাচ্ছে না, আর্থিকভাবেও নিজেদেরকে দেশ ও পরিবারের জন্য সচ্ছল করে তুলছে। পড়াশুনার পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও এরা নিজ মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে, নিজ নিজ অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে। আজকের এ নারীরা কেউ কেউ নিজেদের খরচেই নিজের পড়াশুনার খরচ চালিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ নিজের আয় দিয়ে পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করে আসছেন। ক্লাসের মাঝে মাঝে কাজটাও সামলে নেয়া সহজ নয় কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের তিনজন নারী শিক্ষার্থীকে নিয়ে এই আয়োজন। যারা দক্ষতার সাথে তাদের মেধা ও মননের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে।
ওয়াহিদা জামান সিথি
পোস্ট গ্রাজুয়েশন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে, পাশাপাশি স্টাফ করেসপন্ডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন সংবাদ সংস্থা ইউএনবিতে। ‘স্টুডেন্ট লাইফে চাকরি করো কেন?’ আবার কখনো শুনতে হয়েছে ‘স্টুডেন্ট হয়ে চাকরি করতে এসেছো কেন? চাকরি কি কোনো খেলা?’ এমন অনেক কথাই তাকে শুনতে হয়েছে। চাকরির জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি ফুলটাইম চাকরি করে অফিসে কাজের মান আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে যে সময়টা তাকে পার করতে হয়েছে এবং হচ্ছে তাকে দুঃসাহস বলা গেলেও, খেলা বলার দুঃসাধ্য করা যায় না।
বাবাকে হারিয়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থা যখন কিছুটা নড়বড়ে তখন থেকে শুরু করেন টিউশনি করা। নিজের পরীক্ষা থাকলেও স্টুডেন্টের পরীক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছেন সবসময়। কাজের দায়িত্ব থেকে পিছপা হননি কখনো। মায়ের ধমকই তাকে কখনো কর্তব্য থেকে এড়াতে দেয়নি। মায়ের উত্সাহ আর বিশ্বাসটাই তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে সবচেয়ে বেশি। মা-এর কষ্টটা যেন কম হয় সেই চেষ্টায় সকাল থেকে রাত ছুটেছে নিজের পড়াশোনা আর কাজের পেছনে। সংসারের হাল ধরতে নিজেই সবসময় এই কাজ করে যাওয়ার তাগিদটা অনুভব করেছেন।
প্রথম ইউএনবিতে প্রবেশ করেন ট্রেইনি হিসেবে ২০১৬ সালে, তখন সিথি তৃতীয় বর্ষে। ছয় মাস পর সাব এডিটিং-এ কাজ শুরু করেন। ২০১৮, অনার্স শেষ, রেজাল্টের অপেক্ষার মাঝেই রোহিঙ্গা সংকটের উপর সপ্তাহ খানেকের জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে কাজ করে এসেছেন ইউএনবির হয়ে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সংবাদকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ইউএনবির হয়ে। যেই বিষয়ে সকালে ক্লাসে শিক্ষকদের কাছ থেকে শিখছেন, বিকালে অফিসে ফিরে তারই হাতেখড়ি। সংসার চালানোর দায়িত্বটাও বেশ গর্বের সাথে নিয়ে নিয়েছেন নিজের কাঁধে। এভাবেই চলছে একটু একটু করে সিথির এগিয়ে চলা। যেখানেই থাকুক, সবসময় নিজের কর্তব্যের প্রতি দায়িত্বশীল থাকার ইচ্ছা রয়েছে তার। ভালো ফলাফলের জন্য তিনি পেয়েছেন সঞ্জীব চৌধুরী স্মৃতি বৃত্তি, মিতশুবিশি বৃত্তি, এক্সিম ব্যাংক বার্ষিক বৃত্তি, প্রফেসর সিতারা পারভিন পুরস্কার।
আয়েশা সিদ্দিকা তৃপ্তি
ইডেন মহিলা কলেজের তৃতীয় বর্ষে মনোবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা করছেন। এর সাথে কর্মরত রয়েছেন ক্রাইম রিসার্চ অ্যাণ্ড অ্যানালাইসিস ফাউণ্ডেশনে (ক্রাফ) এর এক্সিকিউটিভ অ্যাডমিন ও ইউথ কাউন্সেলিং উইং-এর হেড হিসেবে। যেহেতু তার পড়াশুনার বিষয় হচ্ছে মনোবিজ্ঞান সেহেতু ঐ আগ্রহ থেকেই তার ইউথ কাউন্সেলিং-এর সাথে কাজের শুরু। এছাড়াও ডিজিটাল টাইম নামে একটি ডিজিটাল মার্কেটিং কোম্পানিতে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে কনটেন্ট এবং প্ল্যানিংয়ে কাজ করছেন। ডেইলি বাংলাদেশ নামে একটি অনলাইন পত্রিকার কনটেন্ট রাইটার হিসেবেও কাজ করছেন।
পড়াশুনার পাশাপাশি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তিন ধরনের তিনটি উন্নয়নমূলক কাজে, তিনটিই একটি থেকে আরেকটি সম্পূর্ণ আলাদা। পড়ালেখায় ছোটবেলা থেকেই বেশ ভালো এবং ছোট সন্তান হওয়ায় পরিবার থেকে ইচ্ছা ছিল তৃপ্তি ডাক্তার হবেন। এইচএসসিতে আশানুরূপ ফলাফল না হওয়ায় ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছেটা পূরণ না হওয়ায় ভেঙে পড়েন তার মা-বাবা। মা-বাবার এই কষ্টকেই শক্তিতে পরিণত করেন তৃপ্তি, দমে যাননি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে। ডাক্তার হতে না পারলেও চিকিত্সাবিজ্ঞানের অংশ হিসেবে মনোবিজ্ঞানকে বেছে নিয়েছেন।
বাবা-মার মুখে হাসি ফোটানোর ইচ্ছা থেকে কাজ করা শুরু করলেও তৃপ্তি চান তার এই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আরো অনেকদূর এগিয়ে যেতে, যেন নিজের সাথে সাথে মানুষের কল্যাণের জন্যও কিছু করতে পারেন। তাই তৃপ্তি মনে করেন প্রতিটি শিক্ষার্থীর উচিত এইচএসসির পরপরই কোনো না কোনো কাজের সাথে জড়িয়ে পড়া উচিত যা তাদের নিজেদের ভেতরের প্রতিভাকে জানতে সহায়তা করবে।
ফারজানা তাসনিম পিংকি
ছোটবেলা থেকেই নানাভাইকে দেখে তার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হবে কিন্তু ভাগ্যে যা লেখা থাকে তা সহজে এড়ানো যায় না। প্রথমবার গোপালগঞ্জ মেডিক্যালে ও দ্বিতীয়বার ফরিদপুর মেডিক্যালে সুযোগ পাওয়ার পরেও রাজধানী ঢাকার অমোঘ আকর্ষণ আমাকে মেডিক্যাল নয় বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই বেছে নিয়েছিলেন পিংকি। তার কাছে ক্যারিয়ারের চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছিল কোন বিভাগে পড়লে কিছু শেখা যাবে সেই চিন্তাটি। কাজেই বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা বিভাগকে।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্স করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরটা কূল রাখি না শ্যাম রাখি করতে করতে কাটিয়ে দিলেও, মূলত দ্বিতীয় বর্ষ থেকে ভাবনা শুরু করেন ভবিষ্যত্ নিয়ে। পরিবারের ছোট সন্তান হিসেবে অতিরিক্ত আদর পেলেও তিনি চাইতেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নিজের হাতখরচ সবসময় নিজেই চালিয়ে নিতে। তার মতে- এখন যখন তার যোগ্যতা আছে নিজের হাতখরচ চালিয়ে নেয়ার, তাহলে কেন বাবার কাঁধের বোঝা কমাতে সাহায্য করবে না!
টিউশনি দিয়েই এর শুরুটা হলেও ডালপালা ছড়িয়েছে আরও অনেক কাজের মধ্য দিয়ে। টিউশনির পাশাপাশি হাতেখড়ি করেন নেশার জায়গা লেখালেখির জগতে। ২০১৫ সাল থেকে বেশ কিছু অনলাইন পোর্টালে কাজ করছেন। বর্তমানে রোর বাংলার ফিচার রাইটার এবং ট্রিপ জোনের এডিটর হিসেবে কাজ করছেন। বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসেন। পড়তে পড়তে পা রেখেছেন বই লেখার জগতেও। আদী প্রকাশন থেকে ইতোমধ্যে একটি অনুবাদ গ্রন্থ বেরিয়েছে, আরও দুটি বই প্রকাশিত হবে এ বছরেই। শখের বশে ফটোগ্রাফিতে হাত দিয়ে মাঝে কিছুদিন ওয়েডিং ফটোগ্রাফিও করেছেন।
পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাওয়ার পর স্নাতকে তৃতীয় স্থান অধিকার করে অর্জন করেছেন সিতারা পারভীন পুরস্কার। এত কাজের ভিড়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে নিরন্তর উত্সাহ দিয়ে এসেছে তার পরিবার, বিশেষ করে মা। পরীক্ষার আগে পড়া বোঝানো থেকে শুরু করে পিংকির লেখার ফিচার ইমেজের মডেল হওয়া- সব জায়গায় সংশপ্তকের মতো পাশে পেয়ে এসেছেন বন্ধুদের। দেশে প্রতিবছর প্রচুর শিক্ষার্থী পাস করে বের হচ্ছে। আর এসব শিক্ষার্থী নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আগে থেকেই কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে নিজেকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যেতে পারেন বলে মনে করেন এসব নারী শিক্ষার্থী।
