পা ধরে ক্ষমা চেয়ে সেই বৃদ্ধা মাকে বাড়ি নিলো ছোট ছেলে

পুলিশের আন্তরিকতায় ঠাকুরগাঁওয়ে ছেলেদের হাতে মারধরের শিকার সেই মায়ের পা ধরে ক্ষমা চেয়ে ১২ দিন পর ঘরে তুলেছে ওই পাষণ্ড তিন ছেলে। এর আগে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ৯০ বছর বয়সের বৃদ্ধা মায়ের শেষ সম্বল ২০ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়ে মারধর করে বৃদ্ধা মাকে ঘরছাড়া করেছিল তারা।

ছেলেদের মারধরের শিকার হয়ে ওই বৃদ্ধা মা গত ১০ দিন ধরে ভিক্ষা করে খেয়ে সরকারি অফিসের বারান্দায় রাত্রিযাপন করে আসছিলেন। টাকার অভাবে ছেলেদের মারধরের শিকার হয়ে চিকিৎসাও করাতে পারেননি তিনি।

শুক্রবার (১৭ মে) জুম্মার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ মার্কেটের নিচতলায় একটি দোকানে কেঁদে কেঁদে ছেলেদের এমন নিষ্ঠুরতার কথা জানান সালেহা বেগম (৯০) নামে ওই মা। এ নিয়ে ‘স্বামীর শেষ সম্পত্তিটুকুও জোর করে লিখে নিল ছেলেরা, বৃদ্ধা মায়ের ঠিকানা এখন রাস্তায়!” শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর নজরে আসে ঢাকা মেট্রোপটিলটন পুলিশের উপ-কমিশনার হাফিজুর রহমান রিয়েল ও ঠাকুরগাঁও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল আসাদ মো: মাহফুজুল ইসলামের।

বৃদ্ধা মায়ের কষ্টের কথা শুনে চুপ থাকতে পারেননি ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। তারা স্থানীয় বালিয়াডাঙ্গী থানার এসআই আমজাদ হোসেন ও হাবিবুর রহমান হাবিবকে দায়িত্ব দেন সেই মাকে ও তার ৩ ছেলেকে খোঁজার। শনিবার সারাদিন অনেক খোঁজাখুজি করে রাতে থানায় সেই মায়ের বড় ছেলে খলিলুর রহমান ও ছোট ছেলে খাজিজুল রহমানকে আনতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরে সেই মাকে থানায় হাজির করা হয় ছেলেদের সামনে।

এ সময় মায়ের পায়ে পরে ক্ষমা চেয়ে আগামী সোমবার লাহিড়ী সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে ২০ শতক জমি ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন জমি লিখে নেওয়া ছোট ছেলে খাজিজুর রহমান।

জিজ্ঞাসাবাদে মায়ের ২০ শতক জমি লিখে নেওয়া ও তাকে মারধরের কথা স্বীকার করে খাজিজুল রহমান। এ সময় এসআই আমজাদ হোসেন ওই ছেলেকে মারধর করার কথা বললে পুলিশের হাত ধরে তাকে মারতে নিষেধ করেন ওই মা। ছেলেকে মারধর সহ্য করতে পারবেন না বলে তাকে ছেড়ে দিতে পুলিশকে অনুরোধ করেন মা।

পরে সোমবার লাহিড়ী সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করে নেওয়া ২০ শতক জমি ফিরিয়ে দিবেন ও নিয়মিত মায়ের দেখাশুনা করবেন এমন শর্তে বৃদ্ধা মাকে পুলিশ ছোট ছেলে খাজিজুর রহমানের হাতে তুলে দেন। এ সময় পুলিশের পক্ষ থেকে ওই বৃদ্ধা মাকে ঈদের শাড়ী, খাদ্য সামগ্রী ও নগদ টাকা তুলে দেওয়া হয়।

জানা যায়, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পাড়িয়া ইউনিয়নের পাঁচ দোয়াল গ্রামের মৃত হাফিজ উদ্দীনের স্ত্রী সালেহা বেগম। বয়স ৯০ ছুঁইছুঁই। বয়সের ভারে ঠিকমত চলাচল করতে পারছেন না। নিজের হাতে সংসার গড়ালেও সেই সংসারে তিনিই ১২ দিনের জন্য ছিলেন পরবাসী।

গত শুক্রবার তিনি তার জীবনের কথা বলতে গিয়ে জানান, বিয়ের পর তিন ছেলের জন্ম হওয়ার কয়েক বছর পরই মারা যান তার স্বামী। স্বামীর শেষ সম্পত্তিটুকু আগলে অনেক কষ্টে খলিলুর রহমান, আব্দুল ও খাজিজুল রহমান নামে তিন ছেলেকে লালন-পালন করেন তিনি। বড় হয়ে তিন ছেলেকে বিয়েও দিয়েছেন তিনি। কিন্তু বিয়ের পর কোনো ছেলেই তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতে রাজি হননি।

এক মাস আগে স্বামীর শেষ সম্বলটুকুও জোর করে টিপসই দিয়ে লিখে নিয়েছেন ছোট ছেলে খাজিজুল। বৃদ্ধা বলেন, আমার তিন ছেলে আমাকে ঘর বানিয়ে দেবে এবং ভরণ-পোষণের শর্তে আমার জমি লিখে নেয়। কিন্তু জমি লিখে দেওয়ার পর আমার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আমি বাড়ি থেকে বের হতে না চাইলে মারপিট করে মুখ ফাটিয়ে দেয় আমার ছোট ছেলে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১০ দিন ধরে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা পরিষদ চত্বরের বিভিন্ন অফিসের বারান্দাসহ উপজেলা পরিষদের দ্বিতীয় গেটের সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের বারান্দায় রাতযাপন করছেন ওই বৃদ্ধা মা।

জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহাফুজ মাসুম বলেন, পুলিশের হস্তক্ষেপে বৃদ্ধা মাকে ঘরে তুলেছে তিন ছেলে। সেই সাথে জমি ফেরতের ব্যবস্থা করে দিয়েছে পুলিশ। সেই সঙ্গে একজন এসআইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মায়ের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার জন্য।

বৃদ্ধার ছোট ছেলে খাজিজুল রহমান বলেন, ভুল বুঝে মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম। এ কয়দিনে মায়ের অভাব বুঝতে পেরেছি। আর মাকে কষ্ট দিবো না। মায়ের সম্পত্তি মায়ের নামে লিখে দিবো।