পাওয়া-নাপাওয়ার অতৃপ্তির ঢেকুর

কিছু পাওয়ার পরও কিছু কিছু মানুষের অতৃপ্তি থেকে যায়। ক্ষুধার্ত মানুষ অল্প খাবার খেলে তার ক্ষুধা আরও বেড়ে যায়। অনেক সময় স্বাধ করে কোন জিনিস চাইলে যদি তা না মেলে, তখন দু:খ বেড়ে যায়। না পাওয়ার চেয়েও কম পাওয়া অনেক সময় অনেক বড় বেদনা হয়ে মানুষের জীবনে আসে।

যখন এটা রাজনীতির বিষয় হয়, তখন ক্ষমতায় থাকলে অনেক রাজনীতিবিদদের অতৃপ্তির বেদনা না পাওয়ার চেয়ে দীর্ঘতর হয়। সেটা স্পষ্টতই তা সব জায়গায় প্রকাশ করে। আওয়ামী লীগ টানা দশ বছর ক্ষমতায় আছে।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা অনেককিছু পেয়েছেন। পাওয়ার পরও অনেকের অতৃপ্তি রয়ে গেছে। তাঁদের অতৃপ্তির প্রকাশ দেখা যায় বিভিন্ন স্থানে। এরকম অতৃপ্তদের মধ্যে কয়েকজন হলেন:

মাহবুবুল আলম হানিফ: ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তিনি নির্বাচন করেননি। প্রধানমন্ত্রী তাকে তাঁর বিশেষ সহকারী করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনি অফিস করতেন। সে সময় তিনি ক্ষমতাবান থাকলেও তার অতৃপ্তি ছিল। তার অতৃপ্তি ঘোচেনি তাতে। তিনি চেয়েছিলেন বিশেষ সহকারীর পদটি মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পর্যায়ে হোক।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি হননি। এরপর তিনি চাইলেন এমপি হতে। ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে বসেন। কিন্তু সে সময় তার অতৃপ্তি আরও বেড়ে যায়। কারণ সংসদ সদস্য হলেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দায়িত্ব হারান। একই সঙ্গে তিনি আশা করেছিলেন তাকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী করা হবে। সেটাও তাকে করা হয়নি। বরং তার আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক হিসেবেই খুশি থাকার কথা ছিল। কিন্তু এতকিছু পেয়েও তার অতৃপ্তি প্রকাশ পায়।

এবার নির্বাচনের পর তিনি নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন তিনি মন্ত্রী হবেন। তার সঙ্গের যুগ্ন মহাসচিব ড. দীপু মনিও মন্ত্রী হয়েছেন। এবং চারপাশের অনেকেই মন্ত্রী হওয়ার প্রেক্ষিতে তিনি আশা করেছিলেন এবার বোধহয় তিনি মন্ত্রী হতে পারবেন। কিন্তু মন্ত্রীত্বের সিকে তার জুটেনি। যার জন্য তার অতৃপ্তি এখন সর্বত্রই প্রকাশ পাচ্ছে।

নসরুল হামিদ: তিনি ভাগ্যবান মন্ত্রীদের একজন। যিনি ২০০১৪তে মন্ত্রী ছিলেন, এই মেয়াদে মন্ত্রীত্ব বহাল রেখেছেন। কিন্তু তারপরও তার অতৃপ্তি রয়েছে। তার আশেপাশের অনেকেই প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন। ড. জাহিদ মালিক প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন। ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন। নসরুল হামিদ মনে করেছিলেন বিদ্যুৎ সেক্টরে তিনি যে কাজ করেছেন সে কাজের জন্য হয়তো তিনি পূর্ণমন্ত্রী হবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি পূর্ণমন্ত্রীর মর্যাদা পাননি, প্রতিমন্ত্রীই রয়েছেন। এনিয়ে আড়ালে আবডালে তাঁর দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।

ইকবালুর রহিম: ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ সালে টানা তিনবারের মত দিনাজপুরের একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। গত মেয়াদে তিনি হুইপ হিসেবে সংসদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এবার তিনি আশা করেছিলেন তার ভাগ্যে হয়তো মন্ত্রীত্ব জুটবে। অন্ত:পক্ষে প্রতিমন্ত্রীত্ব পাবেন। যদিও হুইপ প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাই, তারপরও মন্ত্রীত্ব বলে কথা। দিনাজপুরের খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রতিমন্ত্রী হওয়ায় তার দু:খ এবং বেদনা যেন দীর্ঘশ্বাস হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মন্ত্রীত্ব না পেয়ে তিনি যত কষ্ট পেয়েছেন। তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন খালেদ মাহমুদ চৌধুরীর মন্ত্রীত্বে।

কামাল আহমেদ মজুমদার: পাঁচ বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য তিনি। কিন্তু কোনবারই তিনি মন্ত্রী হতে পারেননি। এবার তিনি মন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু মন্ত্রী হলেও তিনি খুশি নন। কারণ তিনি প্রতিমন্ত্রী। শুধু প্রতিমন্ত্রীই নন, তার মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণ মন্ত্রীও রয়েছে। এ নিয়ে তার দু:খ প্রকাশের কোন রাখডাক নেই। বিভিন্ন মহলে শোনা যায়, প্রতিমন্ত্রী হয়ে তিনি খুব একটা খুশি নন।

এই অতৃপ্তির ঢেকুর রাজনীতিতে চিরন্তন। রাজনীতি এমন একটা বিষয় যেখানে চাওয়ার কোন শেষ নেই। মানুষ যখন একটি পদ পায়, তখন উপরের পদ পাওয়ার জন্য সবসময় উদগ্রীব থাকেন।

যখন সেটা পায় না। তখন তার মধ্যে অতৃপ্তি দেখা যায়। এটাই বোধহয় রাজনীতির চিরন্তন সত্য।