রাজধানীর শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে বাস চাপা দিয়ে হত্যা ও কয়েকজনকে আহত করার দায়ে জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের চালক ও একজন হেলপারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কে এম ইমরুল কায়েশ জনাকীর্ণ আদালতকক্ষে এই রায় দেন। রায়ে এক বাসের মালিক ও একজন হেলপারকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
দুই বাসচালক মাসুম বিল্লাহ ও জুবায়ের সুমন এবং এক বাসের হেলপার কাজী আসাদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার টাকা দিতে ব্যর্থ হলে প্রত্যেককে আরো ছয় মাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলে রায়ে বলা হয়েছে। খালাস পেয়েছেন বাস মালিক জাহাঙ্গীর আলম ও এক বাসের হেলপার এনায়েত হোসেন। মামলার অন্য আসামি আরেকটি বাসের মালিক শাহাদৎ হোসেন আকন্দের পক্ষে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকায় তাঁর বিচার হয়নি।
গতকাল বিকেল ৩টায় রায় ঘোষণা করা হয়। বিচারক শুধু রায়ের উল্লেখযোগ্য অংশ পড়ে শোনান। আদালত বলেন, তিন আসামির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় তাঁদের সাজা দেওয়া হলো। সাজাপ্রাপ্ত আসামি হেলপার কাজী আসাদ পলাতক থাকায় তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পর বা আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাঁর সাজা কার্যকর হবে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, পরিবহন সেক্টরে চালক-হেলপারদের খামখেয়ালিপনায় সারা দেশেই ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ দুর্ঘটনায়, বাসের নিচে চাপা পড়ে নিহত হচ্ছে। এই খামখেয়ালিপনা যেন মানুষ হত্যার নেশায় পরিণত হয়েছে। বাসের চালক-হেলপারদের উদাসীনতায় রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। তাদের বাসের চাকায় প্রতিনিয়ত পিষ্ট হচ্ছে অনেকে।
খামখেয়ালিপনা যেন মানুষ হত্যার নেশায় পরিণত হয়েছে। বাস চালক-হেলপারদের উদাসীনতায় রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ
এ জন্য চালকরা দায়ী উল্লেখ করে আদালত বলেন, চালক-হেলপারদের অধিক জমা বেঁধে দেওয়ার ফলে এক বাস স্টপেজ থেকে আরেক বাস স্টপেজে যাওয়ার জন্য তাঁরা অসম ও অবৈধ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। যার ফলে প্রতিনিয়ত রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনা ঘটছে ও প্রাণহানি ঘটছে। এ ক্ষেত্রে বাস মালিকদের অধিক টাকা উপার্জনের মানসিকতা পরিহার করা আবশ্যক।
আদালত বলেন, রাস্তায় যেসব গাড়ি চলে তার চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করা প্রয়োজন। হালকা যানবাহন চালানোর লাইসেন্স নিয়ে ভারী গাড়ি চালানোর বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরীক্ষা করলে ভারী গাড়ি চালানোর সুযোগ পেতেন না। মালিকপক্ষ কম বেতন দেওয়ার জন্য হালকা গাড়ি চালানোর লাইসেন্সধারীদের নিয়োগ দেয়। উপযুক্ত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ভারী গাড়ি চালানোতে দুর্ঘটনা বেশি হয়। এই প্রবণতা রোধ করতে হবে মালিকদের।
আদালত রায়ে যা বলেছেন
জাবালে নূর পরিবহনের বাস ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৯২৯৭-এর চালক মাসুম বিল্লাহ ও ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৭৬৫৭-এর চালক জোবায়ের সুমন। গাড়ি দুটি তাঁরা পাল্লা দিয়ে চালাচ্ছিলেন। ঘটনার সময় শহীদ রমিজ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের ঢালে বাসে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিল। বাস দুটির একটি অন্যটিকে ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। মাসুম বিল্লাহর বাসটি মীম ও রাজি এবং আরো দশ-বারোজন শিক্ষার্থীকে চাপা দেয়। সবাই আহত হয়। মীম ও রাজীবের আঘাত ছিল মারাত্মক। তাদের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাদের মৃত ঘোষণা করা হয়। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সাক্ষীদের সাক্ষ্য-প্রমাণে এসব প্রমাণিত হয়।
আদালত রায়ে বলেন, ঘটনা ঘটেছে জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের ঢালে। চালক ও হেলপাররা জানতেন ঘটনাস্থলটি ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে সাবধানে গাড়ি চালাতে হবে। অথচ কোনো সাবধানতাই অবলম্বন করা হয়নি। অসাবধান হলে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে—এটা জেনেও বেপরোয়াভাবে তাঁরা গাড়ি চালিয়েছেন। অধিক টাকা উপার্জনের জন্য তাঁরা অসম প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল টাকা। মানুষের জীবন নিয়ে তাঁরা ভ্রক্ষেপ করেননি। জোবায়ের সুমনের গাড়ির হেলপার কাজী আসাদও চালককে অসম প্রতিযোগিতায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। মানুষ মারা যেতে পারে জানা সত্ত্বেও অবৈধ প্রতিযোগিতায় গাড়ি চালান বলে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারার প্রথম অংশের অভিযোগ এই তিনজনের বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তাঁদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হলো।
সেই ‘জাবালে নূর’ নাম পাল্টে এখন ‘তুর পরিবহন’। ফিটনেস নেই, রুট পারমিট নেই—অভিযোগ নিয়েই গাড়িগুলো রাজধানীর সড়কে। এত আন্দোলন, এত আশ্বাস, তার পরও এই অনিয়ম দেখার কেউ নেই। ছবি : কালের কণ্ঠ
আদালত রায়ে বলেন, চালক মাসুম বিল্লাহ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, তিনি আগে থেকেই বেপরোয়া গতিতে চালাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার আগেও কয়েকবার তিনি গাড়ি ফ্লাইওভারের দেয়ালে লাগিয়েছেন। বাসের যাত্রী ও তাঁর হেলাপার এনায়েত হোসেন তাঁকে সাবধানে গাড়ি চালাতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তিনি তাতে ভ্রুক্ষেপ করেননি। হেলপার এনায়েত হোসেনের চালককে সাবধান করে দেওয়ার কথা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ থাকায় প্রমাণ হয় যে তিনি নির্দোষ। এ ছাড়া গাড়ির মালিক জাহাঙ্গীর আলম ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তাই দুর্ঘটনার জন্য তিনি দায়ী নন। এ কারণে এই দুজনকে খালাস দেওয়া হলো।
তবে গাড়ির মালিক তাঁর চালক জোবায়ের সুমনের ভারী গাড়ি চালানোর লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে নিয়োগ দিয়েছেন, এটা প্রমাণিত হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার জন্য তিনি কোনো প্রকার উৎসাহ, প্ররোচনা দেননি। এ কারণে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা গেল না।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া : রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পিপি তাপস কুমার পাল। তিনি রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এই রায় একটি মাইলফলক বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক সাজা। ভবিষ্যতে বাসের চালক ও হেলপাররা সচেতন হবেন এই রায়ের ফলে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. হাসিম উদ্দিন ও মো. আতুকুর রহমান আতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, রায়ে আসামিপক্ষ ক্ষুব্ধ। মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে অপরাধজনক নরহত্যা প্রমাণিত হয়নি। ভিকটিমের সুরতহাল প্রতিবেদন, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও প্রকৃত অবস্থা আদালত আমলে নেননি। এই রায়ের বিরুদ্ধে বাসচালক মাসুম বিল্লাহ আপিল করবেন।
অন্য আসামি জোবায়ের সুমনের পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেটটি এম আসাদুল হকও জানান, রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।
বিচারপ্রক্রিয়া
গত ২৯ জুলাই দুপুরে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ছুটি হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বিমানবন্দর সড়কের র্যাডিসন হোটেলের অন্য পাশে ফ্লাইওভারের নিচে রাস্তায় বাসে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিল। ওই সময় শিক্ষার্থীদের গায়ের ওপর বাস উঠে পড়ে। এতে এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবদুল করিম রাজীব নিহত হয়। গুরুতর আহত হয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সোহেল রানা, রুবাইয়া ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান চৌধুরী, মেহেদী হাসান জিসান, রাহাত, সজীব, জয়ন্তী ও তৃপ্তা। আরো কয়েকজন আহত হয়, যাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ওই দিনই মীমের বাবা মো. জাহাঙ্গীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। থানা কর্তৃপক্ষ প্রথমে দণ্ডবিধির ২৭৯ (বেপরোয়া গাড়ি চালানো) ও ৩০৪(খ) দুর্ঘটনায় মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করে। কিন্তু তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায়, বাসগুলোর চালক-হেলপাররা ইচ্ছাকৃত ও বেপরোয়াভাবে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আঘাত করেন। এ কারণে তদন্ত কর্মকর্তা নরহত্যার ধারা সংযোজন করার আবেদন করেন ১ আগস্ট। আদালত ওই আবেদন মঞ্জুর করেন।
গত ১৪ নভেম্বর আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় গত ২ অক্টোবর। গত বছরের ২৫ অক্টোবর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর দুই বাসের মালিক, দুই বাসের চালক এবং দুই হেলপারকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার অন্য একটি বাসের চালক মো. সোহাগ আলী ও হেলপার মো. রিপন হোসেনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
মামলায় মোট ৪১ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ জন সাক্ষ্য দেন। সাক্ষীদের মধ্যে মামলার বাদী মীমের বাবা, নিহতদের স্বজন, আহত ভিকটিম ও তাদের স্বজন, বিআরটিএর কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট ও চিকিৎসক রয়েছেন।
গণমাধ্যমের প্রশংসা
রায় ঘোষণার সময় বিচারক গণমাধ্যমের প্রশংসা করে বলেন, বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণ তারা তুলে ধরে। দুর্ঘটনায় শত শত লোকের প্রাণহানি ঘটে। যাদের দায়িত্ব অবহেলায় এসব ঘটে তা জাতির সামনে তুলে ধরলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।
