জয়ের কাছে এসে কষ্টের হার

জেতা ম্যাচ হাতছাড়া। জয়ের এত কাছে এসেও এমন হার! শেষ তিন ওভারে ২৭, এরপর ১২ বলে দরকার ছিল ১৪ রান এবং সর্বশেষ সমীকরণ- ৬ বলে চাই ৮ রান। হাতে উইকেট ৫/৬টি। অথচ এই ম্যাচও হারতে হয়েছে বাংলাদেশকে! নাটকীয়ভাবে ৩ রানে দ্বিতীয় ওয়ানডে জিতে তিন ম্যাচ সিরিজে সমতায় ফিরেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২৮ জুলাই সেন্ট কিটসে হবে শেষ ওয়ানডে।

২৭২ রানের বড় টার্গেট। শুরুটা ভালো দরকার। সেটাই কিন্তু করেছিল বাংলাদেশ। গত ম্যাচে কোনো রান করতে পারেননি। এ ম্যাচে তার পরিবর্তে লিটন দাসের একাদশে ঢোকার গুঞ্জন ছিল। কিন্তু শেষমেশ এনামুল হক বিজয়কে রেখেই একাদশ ঘোষণা হয়েছে। তবে দারুণ চাপ ছিল বিজয়ের উপর। প্রথম পাওয়ার প্লেতে দ্রুত কিছু রান তার কাছে চেয়েছিল টিম ম্যানেজমেন্ট।

চেষ্টা করেছেন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যেমনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, সেভাবেই চেষ্টা করেছিলেন এনামুল হক বিজয়। শুরুতে দারুণ মারমুখি ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ব্যাট বলেও হচ্ছিলো। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি উইকেটে। ২ ছক্কা ২ চারে ৯ বলে ২৩ রান করে বোল্ড হয়েছেন বিজয়।

গত ম্যাচে ২৭৯ করে ৪৮ রানে জিতেছিল বাংলাদেশ। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ২০৫ রান করে রেকর্ড গড়েছিলেন তামিম-সাকিব। জিতিয়েছিলেন দলকে। আজও হাল ধরেন দুই কাণ্ডারি। পরিস্থিতি বুঝে দারুণ ব্যাট করছিলেন তারা।মাত্র ১৪.৫ ওভারেই ১০০ রান তুলে নেয় বাংলাদেশ।

৭৩ বলে ক্যারিয়ারের ৪২ নম্বর হাফসেঞ্চুরি পূরণ করে নেন তামিম। হাফ সেঞ্চুরির পর বেশি দূর যেতে পারেননি তামিম। ৫৪ রান করে বিশুর বলে স্ট্যাম্প হয়েছেন গত ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান। তামিম ফিরে যাবার পর কারিয়ারের ৩৯তম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেন সাকিব, ৬২ বলে। তামিম সাকিব জুটিতে আসে মূল্যবান ৯৭ রান।

সাকিব-তামিমের পর হাল ধরেন দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সাকিব আউট হবার পর বস্তুত চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। আস্তে আস্তে সেই চাপ থেকে দলকে টেনে তুলতে থাকেন তারা। ৮৭ রানের মুল্যবান জুটি গড়ার পর ৫১ বলে ৩৯ রান করে আউট হন রিয়াদ। তখন দলের রান ৪ উইকেটে ২৩২, ৪৫.১ ওভারে।

রিয়াদ আউট হবার পরপরই ৫৬ বলে ক্যারিয়ারের ২৯তম হাফ সেঞ্চুরি পূরণ করেন মুশফিক। শেষ ১৮ বলে বাংলাদেশের দরকার ছিল ২৭ রান। মুশফিকের সঙ্গে উইকেটে ছিলেন সাব্বির। ৪৮তম ওভারে আসে ১৩ রান। কিন্তু ৪৯তম ওভারের শেষ বলে ১১ বলে ১২ রান করে আউট হয়ে যান সাব্বির। ৬ বলে দরকার ৮।

বোলার হোল্ডার। প্রথম বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে আউট হয়ে যান মুশফিক। করেন ৬৭ বলে ৬৮ রান।

পরের বলে কোনো রান নিতে পারেননি মোসাদ্দেক। চার বলে দরকার ৮ রান। সহজ সমীকরণ কঠিন হয়ে গেল। পরের বলেও রান পেলেন না মোসাদ্দেক। চতুর্থ বলে দুই রান নিলে শেষ দুই বলে দরকার ৬ রান। পঞ্চম বলে আসে এক রান। শেষ বলে স্ট্রাইকেন্ডে মাশরাফি। দরকার ৫ রান। কিন্তু মাশরাফি নেন ১ রান। এভাবে সহজ ম্যাচ হাতছাড়া করে বাংলাদেশ।

এর আগে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে হেটমায়ারের ৯৩ বলে ১২৫ রানে ভর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর দাঁড়ায় ২৭১ (৪৯.৩ ওভারে অলআউট)।

গায়ানাতে দিবারাত্রির এ ম্যাচে টস জিতে স্বাগতিকদের ব্যাটিংয়ে পাঠান মাশরাফি।প্রথমে উইকেট পাওয়ার কাজটা নিয়মিতই তিনি করছেন।এদিনও মূল্যবান ব্রেক থ্রু এনে দেন অধিনায়ক। ক্যারিবিয়ান ওপেনিং জুটি যখন চিন্তার কারণ হয়ে উঠছিলেন, তখন এভিন লুইসকে ১২ রানে এলবির ফাঁদে ফেলেন অভিজ্ঞ পেসার মাশরাফি বিন মোর্তুজা।

এরপর দলকে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিলেন স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ। ওপেনার ক্রিস গেইলকে ২৯ রানে বিদায় করেন তিনি। এলবি হন গেইল। তিন বছর পর জাতীয় দলে ফিরে খুব একটা সুবিধে করতে পারছেন না এ মারকুটে ওপেনার। আগের ম্যাচে করেছিলেন ৪০।

মাশরাফি, মিরাজের পর সাকিব। গত ম্যাচে ব্যাটে আলো ছড়ালেও উইকেট শূন্য ছিলেন সাকিব। এদিন নিজের দ্বিতীয় ওভারেই মুখ দেখলেন উইকেটের। সাই হোপকে ২৫ রানে বিদায় করেন সাকিব।তবে উইকেটে পেছনে দারুণ কৃতিত্ব ছিল সাব্বিরেরও। কাভার অঞ্চলে দুর্দান্ত ক্যাচ লুফেন সাব্বির।

মাশরাফি, মিরাজ, সাকিবের পর এবার রুবেলের আঘাত। নিজের প্রথম ওভারের ৫ম বলে জেসন মোহাম্মদকে ১২ রানে বিদায় করে দলকে আর একটু স্বস্তি এনে দিয়েছিলেন রুবেল।

নিয়মিতিই উইকেট পড়ছিল স্বাগতিকদের। ২৪ ওভার শেষে ৪ উইকেটে ১০৩ রান। কতদূর যেতে পারবে স্বাগতিকরা? বেশ ভালো পজিশনে ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু হেটমায়ার ও পাওয়েল পঞ্চম জুটিতে এতটাই দৃঢ়তা দেখালেন যে, ধীরে ধীরে বড় স্কোরের দিকে এগিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

রুবেলের বলে যখন জুটি ভাঙলো তখন অনেক দূর চলে গেছে স্বাগতিকরা । ১০৩ রানের সর্বনাশা পার্টনারশিপ গড়ে ৪৪ রানে আউট হন পাওয়েল। ৪২.১ ওভারে ৫ উইকেটে ২০৫। হেটমায়ার খেলছিলেন দারুণ হাত খুলে। খুবই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ান। অধিনায়ক হোল্ডারকে ৭ রানে সাকিব, মুস্তাফিজের বলে নার্স ফিরেন ৩ করে, এরপর পলকে ৪ রানে বিদায় করেন রুবেল। কিন্তু আসল জন মানে হেটমায়ারকে ফেরানো যাচ্ছিলো না কিছুতেই। ৮৪ বলে তুলে নেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয ওয়ানডে সেঞ্চুরি। ৯৩ বলে ১২৫ রান করে যখন রান আউট হলেন তখন ইনিংসের বাকি মাত্র ৩ বল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান দাঁড়াল ২৭১।

৬১ রানে ৩ উইকেট নেন রুবেল। ৪৪ রানে ২ উইকেট মুস্তাফিজের। ৪৫ রানে ২ উইকেট পান সাকিব। একটি করে উইকেট নেন মাশরাফি ও মিরাজ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংস : ৪৯.৩ ওভারে ২৭১/১০( লুইস ১২ , গেইল ২৯, হোপ ২৫, হেটমায়ার ১২৫, জেসন মোহাম্মদ ১২, পাওয়েল ৪৪, হোল্ডার ৭, মাশরাফি ১/৪৪ , মিরাজ ১/৪০, সাকিব ২/৪৪, রুবেল ৩/৬১)

বাংলাদেশ ইনিংস : ৫০ ওভারে ২৬৮/৬: তামিম ৫৪, বিজয় ২৩, সাকিব ৫৬, মুশফিক, রিয়াদ ৩৯, সাব্বির ১২, মোসাদ্দেক ৪ বলে ৩ ; বিশু ১/৩৯, নার্স ১/৩৪)

ফল : ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩ রানে জয়ী

ম্যাচ সেরা : হেটমায়ার