ছোটপর্দায় ঈদ অনুষ্ঠানমালায় যা কিছু খারাপ ছিল

আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলগুলো ‘পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টিং’ প্রতিষ্ঠান নয়। সোজা বাংলায় বুঝতে হবে বিজ্ঞাপন উপেক্ষা করা যাবে না। শুধু প্ল্যানিংটা করতে হবে বুঝমতো। বিজ্ঞাপন হোক ইনসাইটফুল, ক্রিয়েটিভ। তাতে করে বিজ্ঞাপন বিরতির সময়টাও যেন উপভোগ্য হয়।

এবারের ঈদে সবচেয়ে যা চোখে পড়েছেন। নাটকের গল্পের পুনরাবৃত্তি। হাসির নামে ভাড়ামী, ত্রিভুজ প্রেম, সম্পর্কের ভাঙা-গড়া, গ্রাম্য পলিটিক্স কিংবা ছেলেমেয়ের সস্তা প্রেমের গল্প থেকে এখনও বের হয়ে আসতে পারেননি নির্মাতারা। বেশকিছু ভালো কাজ হয়েছে। তিনশতাধিক কাজের মধ্যে সে হিসেবটা খুব বেশি নয়। টিভি নাটকের কোনো মনিটরিং নেই। প্রায় প্রতিটি চ্যানেলে যা খুশি তাই প্রচার হয়েছে। কোন নির্দিষ্ট সময়ও নেই। যখন যার ইচ্ছে হয়েছে নাটক প্রচার করেছেন।

উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, ঈদে আরটিভিতে প্রচার হওয়া `অথবা শ্রাবণের বৃষ্টি` নাটকের কথা। অঞ্জন আইচের রচনা ও পরিচালনায় এই নাটকের প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন আবুল হায়াত ও সাদিয়া ইসলাম মৌ। এখানে মৌয়ের চরিত্রটি অনেকটা হুমায়ূন আহমেদের দেবী উপন্যাসের রানুর মতো। যিনি ভবিষ্যতের অনেক কথা বলে দিতে পারেন।

অন্যদিকে সাইকিয়াটিস্টের চরিত্রে অভিনয় করা আবুল হায়াতের চরিত্রটি মিসির আলীর সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়। নাটকে আবার সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিমান দূর্ঘটনার ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। কোন রকম ক্রেডিট ছাড়াই। তাছাড়া এমন দৃশ্য দেখিয়ে একটা সিমপেথি নেয়ার চেষ্টা।

এবারের ঈদে ছোটপর্দার অনেক অভিনয়শিল্পী প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি নাটক/টেলিছবিতে অভিনয় করেছেন। এই অভিনয়শিল্পীরা পাইকারি হারে অভিনয় করা নাটকের জনপ্রিয়তা কমার অন্যতম প্রধান কারণ। ‘ইতর প্রাণী প্রসব করে বেশি’- প্রচলিত আছে। ঈদে তিন- চারশ’ নাটক-টেলিছবি বানাতে কতজন পরিচালক প্রয়োজন? কতজন নাট্যকার লিখবেন এসব? একজন পরিচালক সর্বোচ্চ কয়টি নাটক বা টেলিছবি পরিচালনা করতে পারেন মনোযোগ দিয়ে?

নির্মাতা সুমন আনোয়ার দাবি করেন, ‘আমরা কাছের মানুষের গল্প না বলে, এজেন্সি এবং পলিসি মেকাররা দর্শকদের উপর এক একটা গল্প চাপিয়ে দিচ্ছি। একটা দূরের ফ্যান্টাসি গল্প মানুষকে চাপিয়ে দিচ্ছি। আর সেই ফ্যান্টাসি দিয়ে আমরা পুরো টেলিভিশন স্টুপিড বক্সটাকে আমরা ভরে রেখেছি। ওখানে আমরা ‘কলাবাবা’ নাটক বানাচ্ছি। এই বাবা সেই বাবা দেখাচ্ছি। আবোল তাবোল হাইপার ব্যাপারগুলো দেখাচ্ছি। গ্রামের এ ওকে কারণ ছাড়াই থাপ্পর মারছে। এটাই একটা নাটকের গল্প। দুর্বোদ্য ইংলিশ বাংলা শব্দ ব্যবহার করছে। যার কোন ব্যকরণ নেই। খামাখাই হাসানোর চেষ্টা। এই যে ভাড়ামো। এটা একটি মাইন্ড সেট আপ হয়ে আছে। যেখান থেকে আমরা এখনো বের হতে পারিনা। ‘

তিনি আরো বলেন, ‘কোন দর্শক কি এটা বলছে যে আপনারা এইটা দেখান। আমরা এটা দেখতে চাই। তাহলে কেন এগুলো দেখানো হচ্ছে। দর্শক বিনোদনের জন্য নাটক দেখতে বসেন। আর আমরা তাদের সঙ্গে প্রতারণা করি। আমি বলবো নাটকের অস্থির সময় শেষ হয়নি। তবুও সেখানে কিছু গল্প ছিল স্বস্তির। এই যে একটা ঈদে তিনশো নাটক হলো। তার কোন গার্ডিয়ান নেই। এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার দরকার। এই যে তিনশো নাটক হয়েছে। সব ছন্নছাড়া যে যার মত প্রকাশ করেছে। ওটা আমাদের জীবনের, সমাজের জন্য কতটা দরকার সে হিসেব করছে না।’

মোশাররফ করিম বলেন, ‘আমাদের তো ফুটেজ দরকার। পুরান ঢাকায় গেছে। গলির মোড়ে ছেলে দাড়িয়ে, ছাদে মেয়ে দাড়িয়ে। এভাবেই চলছে গল্প। এটা জরুরি না যে সবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো দায়িত্ববোধ নিয়ে নাটক নির্মাণ করতে হবে। তবুও এই যে ফান, রোমান্স সবকিছুরতো একটা পরিমিতিবোধ থাকতে হবে। নাটক নির্মাণের জন্য তো টাইমই নেই। বিশদিন আগে ওয়ার্ক অর্ডার পাচ্ছে। সেটে গিয়ে স্ক্রিপ্ট লেখা হচ্ছে। আর্টিস্ট যার সময় পায় তাকে দিয়েই নাটক নির্মাণ হচ্ছে। প্রতিজন ডিরেক্টরের ঘরের কিছু অভিনয়শিল্পী আছে। তাদের দিয়ে লটের পর লট নামানো হচ্ছে।

আগামী ঈদে কি প্রচার হবে। এখনি কাজ শুরু করা উচিত। স্ক্রিপ্ট চাওয়া হলো। লোকেশন ঠিক করা হলো। গল্পের সঙ্গে মানানসই শিল্পীকে নিয়ে কাজ করার সময় পাওয়া গেল। সবকিছুর সুন্দরভাবে ডিজাইন করা হলো। এটা একটা এজেন্সি করতে পারে। একটা টেলিভিশন করতে পারে। তাহলে তো শেষ সময়ে তাড়াহুরা হুরাহুরি লাগে না। পরিচালকরা যেমন অনেক সময় জানে না কোন গল্প নিয়ে কাজ করবে। তেমনি আমরা তো প্রায় সময়ই সেটে গিয়ে শুনি আমার এই চরিত্র। এটা তো আসলে চলতে পারে না।’

যখন শুধু বিটিভি ছিল তখন ঈদে জব্বার আলী এবার কী ঘটনা ঘটাবে তাই দেখার জন্য পুরো বছরের অপেক্ষায় থাকত দর্শক। রাস্তাঘাট ফাঁকা করে দিয়ে নাটক দেখতে বসত দর্শকরা। প্রচারের পর কয়েকদিন ধরে চলত সেই নাটকের আলোচনা-সমালোচনা। এখন কী হচ্ছে সেটা?