গানের মান বনাম ভাইরাল!

ঈদ উপলক্ষে টিভি নাটকে যেমন লগ্নি হচ্ছে তেমনি তার চেয়েও বেশি লগ্নি হচ্ছে বিভিন্ন ওয়েব সিরিজে। সাধারণ দর্শকরা টিভির বোকাবাক্স থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন অনেক আগে থেকেই। হাতের কাছে সবার ডিজিটাল ডিভাইস। সিনেমা, গান, টকশো যা কিছুই চায় না কেন পেয়ে যায়। তাই সকলেই এখন এই ডিজিটাল প্লাটফর্মে ব্যস্তবন্দি। গানের বাজারের পুরোটাই এখন ডিজিটাল প্লাটফর্মেই দৃশ্যমান।

এ কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠিত প্লাটফর্ম সাউন্ডটেক, সঙ্গীতা, সিডি চয়েস, লেজার ভিশন, জি সিরিজ, ঈগল মিউজিক, ধ্রুব মিউজিক স্টেশন, গানচিলের পাশাপাশি নিত্য-নতুন অডিও কোম্পানিগুলো প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের নিয়ে গান প্রকাশ করছে। সকলেরই একটিই টার্গেট সাবস্ক্রাইবার কিভাবে বাড়ানো যায়। সেই লক্ষ্যে এবারো মিউজিক ভিডিওতে গড়ে ৩ লক্ষ টাকা লগ্নি করছে প্রায় প্রতিটি মিউজিক ভিডিওর কাজে।

এ অবস্থায় লগ্নিকারীরা প্রত্যেকেই আশা করছেন ডিজিটাল প্লাটফর্ম থেকেই এই লগ্নি তুলে নেবেন। তবে এক্ষেত্রেও গানের উত্কর্ষ মাপা হচ্ছে ডিজিটাল প্লাটফর্মের ভাইরাল দৌড়েই। সম্প্রতি ‘অপরাধী’ নামের একটি গান ভাইরাল হওয়ায় অনেককিছুর হিসেবই বদলে দিয়েছে। গান নিয়ে যখন বিগ বাজেটে, নামীদামি তারকাদের দিয়ে প্রায় একটি টেলিফিল্মের চেয়েও বেশি বাজেটে মিউজিক ভিডিও তৈরি করছিলেন কতিপয় নির্মাতা। তাদের কাছে হঠাত্ ভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে অপরাধী গানটি। নিঃসন্দেহে একটি মৌলিক গান তার কথা ও সুরের মৌলিকত্বের জায়গায় এভাবে জনপ্রিয়তা পায়। তখন সেটি সত্যিই ভাবনার বিষয়। এরই ভেতরে অপরাধী গানটি সবার মুখে মুখে। পাশাপাশি মাহতিম নামের আরো এক কণ্ঠকে ভাইরাল হিসেবে ডিজিটাল প্লাটফর্মে জনপ্রিয় তকমা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তার মূলত মৌলিক কোনো গান নয়। বরং আলাউদ্দিন আলীর সুর, শিরোনামহীনের সুর বিকৃতির অভিযোগ করছেন একাধিক শিল্পী। তাই গানের মানের উত্কর্ষ আজ বিভ্রান্ত করছে ডিজিটাল ভাইরাল। এরপরও প্রকৃত শিল্পীরা নিজেদের গানের প্রতি দীর্ঘ নিষ্ঠা থেকেই ভালো গান উপহার দেবেন। তাই এবারের ঈদেও প্রত্যেক শিল্পীর সিঙ্গেল গান প্রকাশ পাচ্ছে। এবারো তাহসান খান, মিনার, ইমরান, কনা, লুত্ফর হাসানসহ একাধিক কণ্ঠশিল্পীর সিঙ্গেল গান প্রকাশ পাচ্ছে। প্রায় প্রতিটি কোম্পানি নিজেদের সর্বাধিক লগ্নি করে এই ঈদে। সেক্ষেত্রে সকলেই যেন থাকেন অদ্ভুত ভাইরাল হওয়ার প্রতীক্ষায়। এই ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় যাদের থাকার প্রয়োজন পড়ে না তারা প্রথিতযশা শিল্পী সামিনা চৌধুরী, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, কুমার বিশ্বজিতসহ দেশের গুণী শিল্পীরা। অথচ প্রযুক্তির এই পালাবদলে এখন গানের উত্কর্ষ চুরি করে নিচ্ছে অস্থির ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা। দেশের সবচেয়ে শেষে যোগ হওয়া অডিও প্রতিষ্ঠান ধ্রুব মিউজিক স্টেশন এখন ব্যস্ততম গানের প্রযোজক। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ধ্রুব গুহ নিজেও একজন কণ্ঠশিল্পী।

বর্তমান ভাইরাল প্রবণতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাইরাল আর হিট এক জিনিস নয়। হিট গান হলো, যে গান হূদয়ে গেঁথে যায়। অনেকদিন বেঁচে থাকে। ভাইরাল হলে হয়তো সাময়িক প্রচার পাওয়া যায় বা নিজের পরিচিতির ব্যাপ্তি খোলে, কিন্তু প্রকৃত শিল্পী কখনোই এই অস্থির দৌড়ের জন্য গান করেন না।’ যাই হোক, এরপরও দিনশেষে প্রত্যেক শিল্পী প্রকাশক নিজের গানের ভিউ গোনেন। সেটি ঘণ্টা হিসেবে বা দিনের গড় হিসেবে কে কাকে ছাড়িয়ে গেল সেই হিসেব থাকে। সবকিছুর আলোচনার পাশাপাশি গানের মান, উন্নত লিরিক, মোহ জাগানিয়া সুরই পারবে এদেশের সঙ্গীত অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করতে। সেই সুদিনেই ফিরবে এক সময় এই গোটা ডিজিটাল অডিও ইন্ডাস্ট্রি।