গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও অবরোধে একদিনেই প্রাণ হারালেন অন্তত ৭১ জন। খাদ্য ও ওষুধ সংকটে দুর্ভিক্ষে মৃত্যু হচ্ছে শিশুদের। আন্তর্জাতিক মহল চাপে ফেললেও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত।
গাজায় বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল, খাদ্যাভাবে মারা যাচ্ছে শিশু
গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও কঠোর অবরোধে ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে মানবিক সংকট। একদিকে চালানো হচ্ছে লাগাতার বিমান ও ড্রোন হামলা, অন্যদিকে ক্ষুধা ও অপুষ্টির কারণে প্রতিদিনই মারা যাচ্ছে শিশু ও সাধারণ মানুষ।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭১ জন, যাদের অনেকে ছিলেন ত্রাণের আশায় অপেক্ষমাণ। আল-জাজিরার রিপোর্ট অনুযায়ী, অধিকাংশ নিহতই বেসামরিক নাগরিক।
ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে
শিশু মৃত্যু এখন শুধু পূর্বাভাস নয়, বাস্তবতা
গাজায় খাদ্য, পানি ও ওষুধের চরম সংকটে শুধু শনিবারেই ক্ষুধা ও অপুষ্টিজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫ জনের। চলতি সংকটে এ পর্যন্ত এই কারণে মৃত্যু হয়েছে ১২৭ জনের, যার মধ্যে ৮৫ জনই শিশু।
চিকিৎসা সংক্রান্ত সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব প্রাণহানির বড় একটি অংশ ঘটেছে ত্রাণ নিতে গিয়ে। শুধু একদিনেই মারা গেছেন ৪২ জন বেসামরিক মানুষ, যারা সহায়তা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন বিভিন্ন স্থানে।
ইসরায়েলের ‘সাময়িক হামলা বিরতি’ কতটা কার্যকর?
কোন এলাকায় হামলা বন্ধ হবে তা স্পষ্ট নয়।আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েল শনিবার রাতে ঘোষণা করে, তারা বেসামরিক এলাকায় এবং ত্রাণ করিডোরে সাময়িক হামলা বন্ধ রাখবে। তবে এই ঘোষণায় সুনির্দিষ্ট এলাকা বা সময়ের ব্যাপারে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
জাতিসংঘের দাবি: অবরোধ না উঠলে সংকট আরও গভীর হবে
জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার আহ্বান জানাচ্ছে অবরোধ শিথিল করতে। তাদের ভাষায়, ইসরায়েল কেবল ত্রাণ পাঠানোর অনুমতি দিচ্ছে না, বরং সরাসরি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তবে ইসরায়েল এর জন্য জাতিসংঘকেই দায়ী করছে ত্রাণ বিতরণে ব্যর্থতার কারণে।
আকাশপথে ত্রাণ কার্যত অকার্যকর: UNRWA প্রধানের মন্তব্য
“একটি ট্রাকের চেয়েও কম সহায়তা ফেলা হয়েছে”
ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করছে তারা আকাশপথে ত্রাণ সরবরাহ করছে। তবে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (UNRWA)-র প্রধান ফিলিপ লাজারিনি এই পদ্ধতিকে “মূল সমস্যা থেকে নজর সরানোর এক ব্যয়বহুল কৌশল” বলে অভিহিত করেছেন।
গাজা থেকে আল-জাজিরার সংবাদদাতা হানি মাহমুদ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি প্যালেট ত্রাণ ফেলা হয়েছে, যা একটি ট্রাকের তুলনায়ও কম। তাছাড়া এসব ত্রাণ ফেলা হচ্ছে এমন স্থানে, যেগুলো ‘সামরিক নিষিদ্ধ এলাকা’, যেখানে রাতের বেলায় ত্রাণ সংগ্রহ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
‘নিরাপদ এলাকা’তেও ড্রোন হামলা, নিহত ছয়জন
ইসরায়েলের ঘোষিত Safe Zone আদৌ নিরাপদ নয়
শনিবার ইসরায়েল ড্রোন হামলা চালায় গাজার খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায়, যেটিকে আগে ‘নিরাপদ এলাকা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে প্রাণ হারান কমপক্ষে ৬ জন। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে, ইসরায়েলের ঘোষিত Safe Zone আদৌ নিরাপদ কিনা।
জরুরি সেবা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা
গাজার সিভিল ডিফেন্স সংস্থা জানিয়েছে, জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের অভাবে তাদের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যেন দ্রুত হস্তক্ষেপ করে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
চিকিৎসা সূত্রগুলো সতর্ক করেছে, গাজায় এখন গণহারে অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা আর অনুমান নয়—এটা বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাজা এক ‘নীরব গণকবরে’ পরিণত হচ্ছে
এই মুহূর্তে গাজা একটি চলমান মানবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যেখানে মৃত্যু আসছে দুই দিক থেকে—একদিকে সহিংস হামলা, অন্যদিকে ক্ষুধা ও চিকিৎসার অভাব। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব এখনই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া, না হলে এই ভূখণ্ডে প্রতিদিনই লেখা হবে নতুন নতুন মৃত্যুর পরিসংখ্যান।
