‘চিঠি’ শব্দটি যেন ইতিহাসের কোন এক ছোট্ট নাম, যার ব্যবহার আধুনিক প্রজন্মের কাছে একেবারেই এক অজানা ব্যাপার। অথচ ছোট্ট এই শব্দটি একটা সময় ছিল সকল আশা-আকাংখা-ভালোবাসার আবেদন। কত আনন্দ-বেদনা, ভালোবাসা, আশীর্বাদ, সুসংবাদ-দুঃসংবাদের বার্তা বয়ে নিয়ে আসত। আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়েছে চিঠি, শুন্য হয়েছে ডাক বাক্স, ভিড় কমেছে ডাকঘরে।
দিন বদলের সাথে সাথে ফুরিয়ে গেছে চিঠির প্রয়োজন। পাল্টে গেছে চিঠির ধরণ, পাঠানোর মাধ্যম। একটা সময় ছিল যখন চিঠি পাঠানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো পায়রা অথবা লণ্ঠন হাতে টুনটুন ঘণ্টা বাজিয়ে ছুটে চলা ডাক হরকরা। একটি চিঠির অপেক্ষায় মানুষ দিনের পর দিন কাটিয়ে দিয়েছে। সে সময় চিঠি মানেই হলো জীবনের মূল্যবান সময় গুলোর অপেক্ষা। কখনো অপেক্ষায় কাঙ্ক্ষিত সংবাদ মিলেছে আবার কখনো অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে ফুরিয়েছে প্রহর; কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় পৌছায়নি চিঠি, পড়া হয়নি কাঙ্ক্ষিত সংবাদ।
একটা সময় চিঠি আসত নানান রং আর সুবাস গায়ে মেখে। ভালোবাসার মানুষের পাঠানো চিঠিতে থাকতো সুগন্ধি ফুলের পাপড়ি। ছিল ভালোবাসার ছোঁয়ায় গাথা প্রতিটি শব্দ। শহরে থাকা ছেলের কাছে আসতো বাবা-মায়ের আদর মাখা বাণী। বাবার কাছে ছোট্ট ছেলে-মেয়ের চিঠিতে আসতো ভুলে ভরা বানানে আবদারের তালিকা। সেসব চিঠির খাম হাতে পেলেই যেন বুকের গভীরে এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করত। চিঠি খোলা থেকে পড়ার শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত অনুভূতি এতটায় রোমাঞ্চকর হতো যে তা আসলে লিখার ভাষায় প্রকাশ করা বড়ই কঠিন। আবার সেসব চিঠি লিখে পাঠানোর পর উত্তরের অপেক্ষায় ভাবনার পাতা যেন ভরে যেন নতুন নতুন শব্দ লিখার আকাঙ্ক্ষায়।
কবি মহাদেব সাহা’র ‘চিঠি দিও’ কবিতার মতো এখন কেউ তার প্রেমিকাকে বলে না
‘‘করুণা করে হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙুলের মিহিন সেলাই
ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।
চিঠির ব্যবহারকে প্রযুক্তি যে সহজতর করেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থার এক অত্যাধুনিক যুগে আমরা বসবাস করছি। চিঠির জায়গা দখল করেছে ই-মেইল, ম্যাসেঞ্জারের মত আধুনিক মাধ্যমগুলো। ঘুচিয়ে দিয়েছে অপেক্ষার পালা। কিন্তু চিঠির রয়েছে স্থায়িত্ব। এখানে আবেগও কাজ করে। ই-মেইল ও ম্যাসেঞ্জারে মানুষের মানবিক জায়গাটা ধরা যায় না। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাওয়া চিঠিতে কখনোই হাতের চিঠির আনন্দ পাওয়া সম্ভব না।
