মেহেদি হাসান
‘ভেল্লাই কুন্ডা না মারি পিন্ডা, ইল্লাই আরিতি…’, ভূ-ভারতে বাহুবলীর ডায়লগ হুবহু নকল করার ক্ষমতাসম্পন্ন একমাত্র ছেলেটি (এটা সে স্বয়ং দাবি করে) তার ভিতরের ট্যালেন্ট নিঃসঙ্কোচে নিংড়ে বের করে আনছে। আর আমরা নীরব দর্শক হচ্ছি তার শিকার। ইকবাল ভাই থামিয়ে না দিলে আরও অনেকক্ষণ আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হতো। কষ্টের বোঝা লঘু হলো। যাক বাঁচা গেল। আমরা তো বাঁচলাম। কিন্তু ভাইয়ের কড়া ধমকে সেই প্রতিভাবান ছেলেটির মন একমুহূর্তে ভেঙে যাওয়ার কথা। অথচ সে মন ভাঙেনি। কারণ সে মন যে বড়ই বেশরম আর নির্লজ্জ।
এখন খানিকক্ষণ ছেলেটির পরিচয় দিই। তার বর্তমানে প্রথম এবং প্রধান পরিচয় হলো যে সে ‘বাহুবলী’ ছবিটির এবং ‘বাহুবলী’র একজন একনিষ্ট অনুরাগী। তার ভিতর অবশ্য অনেক আগে থেকেই তামিল-তেলেগু ছবির ভাইরাস ছিল। কিন্তু সেটা ছিল একরকম সুপ্তাবস্থায়। ‘বাহুবলী’ ছবিটি রিলিজ হওয়ার পর সেটা পুরোপুরি সুপ্তাবস্থা অতিক্রম করে মারাত্মক অবস্থায় রূপ নিয়েছে। ‘বাহুবলী’র দ্বিতীয় কিস্তি বের হয়েছে তাও কয়েক বছর হলো, কিন্তু এর ভিতরের বাহুবলী এখনো তরতাজা। সময় আর সুযোগ পেলেই এর একমাত্র কাজ বাহুবলীর নকল করা। ওহ। একটা কথা। ছেলেটির পিতৃপ্রদত্ত একটি নাম আছে। সিরাজ। পুরোটা হলো সিরাজ-উর-রশিদ। ওরফে সিরাজ। নাম সিরাজ হলেও সিরাজ-উদ-দৌলার ছিটেফোঁটাও নেই এর মধ্যে। মিলিয়ে দেখেছি। অতএব আর সন্দেহের অবকাশ নেই।
পুরো মেসের এমন কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না যে এই বাহুবলী মানে সিরাজের প্রতিভার শিকার হয়নি। তবে একটা জিনিস সবারই চোখে পড়ে। অবশ্য চোখে পড়ে যখন সে খালি গায়ে অভিনয় করে। সেটা হলো তার বক্ষপিঞ্জর। খালি গায়ে মোটামুটি তার বুকের সবক’টি হাড়ই সবার চোখে পড়ে। যেন হাড়ের উপর শুধু চামড়া লেপ্টানো হয়েছে। মাঝখানে মাংসের লেশমাত্র নাই। সবাই কি করে জানি না। তবে আমি এই হাড্ডিসার বাহুবলীর খালি গায়ের অভিনয়টা উপভোগ করি।
২.
প্রতিবছরের মতো এবছরও আমাদের মেস থেকে পিকনিকের আয়োজন করা হলো। আয়োজনে প্রাণপ্রিয় ও উদার বড়ভাইয়েরা। মোট পঁয়ত্রিশজন যাব। বিশজন জুনিয়র আর পনেরজন সিনিয়র। জায়গার নাম সারিয়াকান্দি। বগুড়া শহর থেকে উত্তরে। ম্যানেজমেন্টের সবটাই প্রধানত সিনিয়ররা দেখছেন। আর আমরা হচ্ছি তাদের সহযোগী। সহযোগী হওয়ায় পিকনিকের মজাটা একটু ভালোভাবে নিতে পারছি আমরা। আমাদের সাথে সিরাজও যাচ্ছে। প্রতিদিনের মতো আজও চলছে তার ডায়লগবাজি। আমার কাছে তো ওর সব ডায়লগই একরকম লাগে। সেই একই ধরনের ডায়লগগুলো বিভিন্ন ভঙ্গিমায় পেশ করছে সে। কখনো ডানচোখ নাচিয়ে তো কখনো বামচোখ নাচিয়ে। গাড়ির ভিতর সবাই ফ্রিতে বিনোদনের একটা মাধ্যম পেয়েছে। কে বেশি বিরক্ত হচ্ছে বলতে পারব না, তবে সবচেয়ে বেশি মজা সিরাজ নিজেই পাচ্ছে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।
এভাবে একটু বিরক্তি, একটু বিনোদন নিতে নিতে শেষমেশ এসে পৌছলাম পিকনিকস্পটে। নদীই এখানকার সৌন্দর্য। পরে যে এই নদীই কাল হবে কে জানত?
খাবার-দাবারের ব্যবস্থা কে করছে জানি না, কীভাবে করছে সেটাও জানি না। আমরা চারবন্ধু বসে আছি নদীর পাড়ে বসানো পাথরের ব্লকের উপর। চারজনের ভিতরে কিন্তু সিরাজও আছে। গল্প-আড্ডার কোনো কমতি হচ্ছে না। বরাবরের মতো সিরাজ আবার সুযোগ পেয়েছে তার অভিনয় দেখানোর। তাই বসে বসেই খানিকক্ষণ তার পুরোনো ক্যাসেট চালাল সে। কিন্তু আসল ঘটনা তো ঘটল সে দাঁড়ানোর পর। নদীর পাড়ের উচ্চতা আর পরিবেশ হয়তো তার খুব ভালো লেগেছিল। তাই সে বাহুবলীর শপথের সময়কার ভাষণ বাহুবলীর মতো করেই দাঁড়িয়ে দিতে চাইল। যা ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা দিক। আমাদের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমরা চারজন ছাড়াও যে এখানে আরেকটি প্রাণী আছে সেটা আর আমরা লক্ষ করিনি। সেটা যে এতবড় ঘটনা ঘটাবে কে জানত?
‘অমরেন্দ্র বাহুবলী, ইয়ানি নেনুউউউ..’, একহাত উঁচু করে শপথের ভঙ্গিতে কেবল এতটুকু উচ্চারণ করতে পারল ছেলেটা। পরক্ষণেই রোগাগোছের একটা ষাঁড় তেড়ে এসে তার কোমরে দিল এক গুঁতো। এক গুঁতোতেই বাহুবলী কাত। গড়াতে গড়াতে গিয়ে পড়ল নদীর ভিতর। পুরো ঘটনা বুঝতে আরেকবার ঘটনাটি ভাবতে হলো আমাকে। খানিকবাদে বুঝলাম পুরো ব্যাপারটা।
এর মধ্যে ‘বাঁচা বাঁচা’ চিত্কারে চারদিক ময়ময়। অন্যরকম এক অবস্থা। দেখি বাহুবলী পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। আমরা কেউই জানতাম না যে বাহুবলী সাঁতার জানে না। সমীর তো বলল অজ্ঞান না হওয়ার আগে কেউ তুলিস না ওরে। অজ্ঞান হওয়ার আগেই অবশ্য তোলা হয়েছিল তাকে।
৩.
এরপর আর কোনোদিন সিরাজ বাহুবলী হওয়ার চেষ্টা করেনি। পুরো মেস যা পারল না সেটা করে দেখালো একটা রোগাটে ষাঁড়। গুঁতোটা ঠিক জায়গাতেই পড়েছিল, তাই পরে আর শিক্ষার ঘাটতি পড়েনি। ব্যাপারটা নিয়ে কয়েকদিন খুব হাসাহাসি হয়েছিল। পরে আর অবশ্য কেউ সেটা মনে রাখেনি। সে যাক। কিন্তু কি কারণে যে সিরাজ বাহুবলীর নকল করা বন্ধ করে দিল সেটা হয়তো সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কোনো গ্রন্থে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে।
বগুড়া ক্যান্ট. পাবলিক কলেজ, বগুড়া।
