একাদশ জাতীয় সংসদে প্রথম বক্তব্যে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

সারাদেশের ভোটাররা আমাদের সংসদ সদস্যদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে এ সংসদে পাঠিয়েছেন। আমরা তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবো। আমাদের লক্ষ্য হবে সারাদেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ধরে রাখার পাশাপাশি মাদকমুক্ত, জঙ্গিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত একটি উন্নত দেশ গড়ে তোলা এবং দেশের মানুষের জন্য শান্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বুধবার (৩০ জানুয়ারি) একাদশ জাতীয় সংসদের প্রধান অধিবেশনের এসব কথা বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
সংসদে দাড়িয়ে তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাদশ সংসদে বাংলাদেশের জনগণ ভোট দিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছে। আজকে সে সংসদ আপনাকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করেছে এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে ফজলে রাব্বী সাহেবকে নির্বাচিত করেছে। আমি আপনাকে আন্তরিকভাবে অভিনন্দন জানাচ্ছি, ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

আমি আজকের দিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় চার নেতার প্রতি এবং ৩০ লক্ষ শহীদ এবং আমরা চলার পথে যাদেরকে হারিয়েছি সংসদ সদস্যসহ তাদেরকে আমি স্মরণ করছি।এরপর শেখ হাসিনা বলেন, ‘গণতান্ত্রিক ধারায় সমালোচনা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। আমি বিরোধী দলের সদস্যদের আশ্বাস দিতে পারি যে তারা তাদের সমালোচনা যথাযথভাবে করতে পারবেন। এখানে আমরা কোনো বাধা সৃষ্টি করব না। কোনোদিন বাধা আমরা দেইনি, দেবও না’।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, অনেক চড়াই-উতড়াই পার হয়ে আমরা একটা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছি। কারণ এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ, মা বোনেরা, প্রথম যারা ভোটার তারা, তরুণ ভোটাররা সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। একটি সফল নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এবং কৃতজ্ঞতা জানাই’।
তিনি বলেন, ‘সংসদ নেতা হিসেবে আমার দায়িত্ব সংসদের সকল সদস্যের অধিকার যেমন দেখা এবং সেই সঙ্গে আপনি স্পিকার হিসেবে সব সদস্য যাতে সমানভাবে সুযোগ পায়, এখানে সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই যেন সমান সুযোগ পায় অবশ্যই আপনি সেটা দেখবেন। এ ব্যাপারে আমরা আপনাকে সব রকম সহযোগিতা করব’।

সংসদ নেতা বলেন, ‘গণতন্ত্রই একটি দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর তা আজ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রমাণিত সত্য। আজ আমরা আর্থসামাজিকভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছি। এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাংলাদেশের জনগণকে একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে স্বপ্ন, যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি এ দেশকে স্বাধীন করেছিলেন, সেই ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা আমরা ইনশাআল্লাহ গড়ে তুলব। এটাই আমাদের লক্ষ্য’।

জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের জীবন বড় বিচিত্র। আমাদের আপনজন হারিয়ে এই শোক প্রস্তাব করতে হয়। আমি সৈয়দ আশরাফকে ছোটবেলা থেকেই চিনি। আমার পরিবারের সদস্য। কামালের সঙ্গে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। একসঙ্গে যুদ্ধ করেছে। আমি আমার ছোটবোন বিদেশে ছিলাম। সেসময় আশরাফ আমাদের সঙ্গে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করে। ও আমাকে বড় বোনের মতই জানতো। ৭৫ এর ১৫ আগষ্টের পর যারা আওয়ামী লীগে ছিলেন তারা প্রত্যেকেই একটা দু:সময়ের মধ্যে কাটিয়েছেন। আমিই ৯৬ সালের আশরাফকে দেশে নিয়ে আসি। দেশে এসে রাজনীতি করতে বলি। যখনই তাকে কোন দায়িত্ব দিয়েছি।

সে সুনিপুনভাবে তা পালন করেছে। সবসময় পড়াশুনার মধ্যেই থাকতো। আশরাফ এত সহজ সরল ছিল। আমরা যখন লন্ডনে ছিলাম ওকে কল দিয়ে আমাদের বাসায় আসতে বলতাম ভালো রান্না হলে। ও বলতো ট্রেনের তো ভাড়া নেই। তখন বলতাম কোনভাবে ম্যানেজ করে আসো। তারপর দিয়ে দিবো। তার বোনকে আমরা নমিনেশন দিয়েছি। আমরা এতটুকু বলবো তার স্মৃতি সবসময়ই আমাদের মাঝে থাকবে। আমরা সবসময় তার কথা মনে রাখবো।’

সৈয়দ আশরাফকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যান প্রধানমন্ত্রী। আবেগাপ্লুত হয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমার কথা বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’ এর কিছুক্ষণ পরই দ্রুত নিজের বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন বিরোধীদলীয় উপনেতা ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু।

গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ একাই জয়ী হয় ২৫৮টিতে। ২২টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে জাতীয় পার্টি। দশম জাতীয় সংসদে এই দলটি ৩৪টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছিল।—-বিডি২৪লাইভ