বোন জামাই চোখের সামনে পুড়ে ম’রছে। ভেতরে যাওয়ার জন্য বারবার চেষ্টা করেছি কিন্তু আমাদের যেতে দেয়া হয়নি। যখন আ’গুন লাগে আইসিইউতে নার্স, চিকিৎসক কেউ ছিল না- এমনই অ’ভিযোগ করেছেন নি’হত কাজী গো’লাম মোস্তফার (৬৬) শ্যালক হাসান মাসুদ। তিনি বলেন, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কাউকে পাওয়া যায়নি। ভেতরে যেতে চেয়েছি কিন্তু আনসার সদস্যরা প্রবেশ করতে দেয়নি। অনেক পরে হাসপাতা’লে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে রোগীদেরকে সিসিইউতে স্থা’নান্তর করেন। ভেতরে সৃষ্ট ধোঁয়ার কারণেই বোন জামাই গো’লাম মোস্তফার মৃ’ত্যু হয়েছে বলে তিনি অ’ভিযোগ করেন। কাজী গো’লাম মোস্তফার মে’য়ে কাজী রাবু বলেন, ৫-১০ মিনিট সময় পেলে বাবাকে বাঁ’চাতে পারতাম।কিন্তু তারা আমাকে ঢুকতে দিলো না।
বুধবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় করো’না আ’ক্রান্ত রোগীদের জন্য বরাদ্দ আইসিইউতে আ’গুন লাগার পর তিনজনের মৃ’ত্যু হয়েছে। মা’রা যাওয়া আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (৪৮), কাজী গো’লাম মোস্তফা (৬৬) ও কি’শোর চন্দ্র রায় (৫৮) আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, আ’গুনে তাদের মৃ’ত্যু হয়নি। আইসিইউ থেকে স্থা’নান্তরের সময় তারা মা’রা যান। আ’গুনে আইসিইউ ইউনিটের সবকিছু পুড়ে গেছে। সেখানে আর রোগী রাখার অবস্থা নেই।
কাজী গো’লাম মোস্তফার মে’য়ে কাজী রাবু বলেন, ‘আমা’র বাবা কোভিড আ’ক্রান্ত হয়ে ১১ তারিখে ভর্তি হলে ওইদিনই তাকে আইসিইউতে স্থা’নান্তর করা হয়। সকালে আ’গুন লাগার সময় আমি হাসপাতা’লেই ছিলাম। অনেকেই যার যার রোগী নিয়ে বের হয়ে যায়। কিন্তু আমা’র বাবাই শুধু বের হতে পারেনি। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে বাবাকে মৃ’ত অবস্থায় উ’দ্ধার করে।
মৃ’ত কি’শোর চন্দ্র রায়ের (৭২) মে’য়ে সীমা রায় বলেন, গত ৯ই মা’র্চ বাবাকে করো’না ইউনিটে আইসিইউ’র ৮ নম্বর বেডে ভর্তি করা হয়। তার ফুসফুসে সংক্রমণটা অনেক বেশি ছিল। তিনি হাই-ফ্লো অক্সিজেন সাপোর্টে ছিলেন। এর আগে করো’না পজেটিভ হয়ে পরবর্তীতে নেগেটিভ হন। কিন্তু তার ফুসফুসের সংক্রমণ ভালো হচ্ছিলো না। এ বিষয়ে চিকিৎসকরা সবসময় বলছিলেন কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে তার অবস্থা খুব একটা ভালো না। তার ফুসফুসের সংক্রমণটা এতটাই বেশি ছিল যেটার উন্নতি হচ্ছিল না। এর আগে বাবা গ্রিন লাইফ হাসপাতা’লে ভর্তি ছিলেন। ১৯শে ফেব্রুয়ারি থেকে বাবা অ’সুস্থ। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মক’র্তা ছিলেন। আম’রা চার বোন। নি’হতের মে’য়ের জামাই তনুশ্রী রঞ্জন দাস বলেন, আইসিইউ’র মধ্যে যে অ’গ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল সেগুলো কাজ করছিলো না। আইসিইউ’র ভেতরে বেডগুলোর লক খুলে দ্রুত তাদের বের করার মতো কোন নার্স বা ওয়ার্ড বয় কেউ ছিল না। আম’রা নিজেরাই দৌড়াদৌড়ি করেছি। আম’রাই বাবার চাদর ধরে, মাস্ক খুলে বাবাকে বের করি। এ সময় দায়িত্বরত কোনো চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ড বয় কেউ ছিল না। আমাদের ধারণা অক্সিজেনের অভাবে অথবা আ’গুনে পুড়ে তার মৃ’ত্যু হয়েছে।
নি’হত কি’শোর চন্দ্রের মে’য়ে অ’গ্নিকা’ণ্ডের ভ’য়াবহ বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, যখন আ’গুন লাগে তখন আম’রা বাবার কাছেই ছিলাম। এ সময় ১২ নম্বর বেডে হঠাৎ আ’গুন লেগে যায়। পরবর্তীতে সেখান থেকে সিলিংয়ে আ’গুন লাগে। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পুরো কক্ষটিতে আ’গুন ছড়িয়ে পড়ে। বাবাকে সকাল ৮টার সময় খাওয়ানোর জন্য এবং তার ওষুধগুলো রেডি করছিলাম। তখনই অ’গ্নিকা’ণ্ডের ঘটনা ঘটে। অ’গ্নিকা’ণ্ডের পর সকাল ৯টার দিকে আইসিইউ পুরো অন্ধকার ছিল। এ সময় লাইফ সাপোর্টে থাকা একজন রোগীর শরীরের কিছু অংশ পুড়ে যেতে দেখি। তাকে তখন বের করার মতো কেউ ছিল না। পরবর্তীতে একই ভবনে থাকা অন্য ফ্লোরের আইসিইউতে কিছু রোগীকে স্থা’নান্তর করা হয়েছে। নি’হত আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের (৪৮) আত্মীয় আব্দুস সাত্তার বলেন, তিনি পেশায় একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ছিলেন। গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ। করো’না আ’ক্রান্ত হওয়ার পর গত ৪ঠা মা’র্চ তাকে আইসিইউ’র ১১ নম্বর বেডে ভর্তি করা হয়।
সকাল আটটার দিকে হাসপাতা’লের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় কোভিড আইসিইউতে এই অ’গ্নিকা’ণ্ডের ঘটনা ঘটে। হাসপাতা’লের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় আ’গুনের সূত্রপাত। এ সময় আইসিইউতে ১৪ জন রোগী ছিলেন। তাদের তিনজনের মৃ’ত্যু হয়। বাকিদের পুরাতন বার্ন ইউনিটের আইসিইউ, নতুন ভবনের সিসিইউসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরিয়ে নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
অ’গ্নিকা’ণ্ডের ঘটনায় প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে হাসপাতালটির এনেসথেইসওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. মোজাফ্ফর হোসেনকে প্রধান করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতা’লের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক ১০ সদস্যের একটি ত’দন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটিকে সাত কর্ম’দিবসের মধ্যে ত’দন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ সময় করো’না ইউনিটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় বলে জানিয়েছেন হাসপাতা’লের পরিচালক। পুড়ে যাওয়া আইসিইউ ইউনিট পরিদর্শনে ঢাকা মেডিকেলে আসলেও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এদিকে ঢামেকের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় করো’না আ’ক্রান্ত রোগীদের জন্য বরাদ্দ আইসিইউতে অ’গ্নিকা’ণ্ডের ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের ত’দন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তর। অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (এম্বুলেন্স) নূর হাসানকে প্রধান করে এ ত’দন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ফায়ার সার্ভিস সদর দফতরের ডিউটি অফিসার জিয়া রহমান বলেন, প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে আইসিইউর জানালা ভেঙে ধোঁয়া বের করা হয়। ভেতর থাকা রোগীদের উ’দ্ধার করে বার্ন ইউনিটের এইচডিইউ ও পুরাতন ভবনে আইসিইউতে পাঠানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের বিভাগীয় উপ-পরিচালক (ডিডি) দেবাশিষ বর্ধন বলেন, আ’গুন নিয়ন্ত্রণে প্রথমে তিনটি এবং পরবর্তীতে দুটি মোট পাঁচটি ইউনিট পাঠানো হয়। তবে প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে আ’গুন নির্বাপণে বেগ পেতে হয়েছে।
