লোকসানের কারণে এ দেশে বহু পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু পাটকলগুলোও খুব বেশি লাভে নেই। এ অবস্থায় পাটকলের উন্নয়নে সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। সম্প্রতি ব্যাপক পরিসরে পাটকাঠি থেকে অ্যাকটিভেটেড চারকোল উৎপাদন শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বদলে যাবে পাটশিল্পের অবস্থান। পাট থেকে খুলবে সম্ভাবনার দ্বার। দেশের মোট উৎপাদিত পাটকাঠির ৫০ ভাগ চারকোল উৎপাদন করে রপ্তানি করতে পারলে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা অর্জন সম্ভব বলে জানান এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। তারা এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারের প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা চান।
সম্প্রতি সচিবালয়ে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী জানিয়েছেন, প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ টন পাটকাঠি উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে যদি ৫০ ভাগ পাটকাঠি চারকোল উৎপাদনে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন চারকোল উৎপাদন সম্ভব হবে, যা বিদেশে রপ্তানি করে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। একই সঙ্গে সারাদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা দিন দিন বাড়বে।
দেশে ২০১২ সালে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে পাটকাঠি থেকে অ্যাকটিভেটেড চারকোল উৎপাদন শুরু হয়। ওই বছরই চীনে এ পণ্য রপ্তানি হয়। ৬ বছর আগে পাটকাঠিকে ছাই বানিয়ে তা রপ্তানির পথ দেখান ওয়াং ফেই নামের চীনের এক নাগরিক। বর্তমানে চীন ছাড়াও তাইওয়ান, জাপান, হংকং ও ব্রাজিলেও এটি রপ্তানি হচ্ছে। এ ছাড়া চারকোলের বড় বাজার রয়েছে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে।
চারকোল বা অ্যাকটিভেটেড কার্বন পাটখড়ি থেকে উৎপাদিত একটি পণ্য। এ ছাড়া কাঠের গুঁড়া, নারিকেলের ছোবড়া ও বাঁশ থেকেও চারকোল উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে দেশে এখন পর্যন্ত পাটখড়ি থেকেই চারকোল উৎপাদিত হচ্ছে। বিশেষ চুল্লিতে পাটখড়ি লোড করে তাতে আগুন দেওয়া হয়। ১০-১২ ঘণ্টা রাখার পর চুলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেন চুলার ভেতরে অক্সিজেন প্রবেশ করতে না পারে। এভাবে ৪ দিন রাখার পর এটি কার্বনে পরিণত হয়। সেই কার্বন প্যাকেজিং করে রপ্তানি হয় বিদেশে। একসময় পাটকাঠি রান্নার জ্বালানি, ঘরের বেড়া, পানের বরজে ব্যবহৃত হতো।

এর পর আখের ছোবড়ার সঙ্গে মিশিয়ে পার্টিকেল বোর্ড তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার হতো। এখন চারকোল তৈরির মিলে ব্যবহৃত হওয়ায় পাটকাঠির চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে পাটচাষিও লাভবান হচ্ছে। পাটের সোনালি আঁশ ও রুপালি কাঠি মিলে এ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাটখড়ি বা পাটকাঠির কার্বন চারকোল নামে পরিচিত। চীনসহ বিভিন্ন দেশে পাটকাঠি পুড়িয়ে পাওয়া কার্বন থেকে আতশবাজি, কার্বন পেপার, প্রিন্টার ও ফটোকপিয়ারের কালি, মোবাইলের ব্যাটারি, ফেসওয়াশের উপকরণ ও প্রসাধনপণ্য, পানির ফিল্টার, বিষ ধ্বংসকারী ওষুধ, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, দাঁত পরিষ্কারের ওষুধ ও সারসহ নানা পণ্য তৈরি হয়। চারকোল বা কয়লা ছাড়াও পাটকাঠি থেকে অ্যাকটিভেটেড কার্বন উৎপাদন করা যায়। ইউরোপে ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্ল্যান্টে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে।
চারকোল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জয়া কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জয় হোসাইন জানান, চারকোল উৎপাদনে ফলে কৃষকরা এখন পাটের দামের পাশাপাশি পাটকাঠিরও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন। ফলে তারা নতুন করে পাট চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তিনি আরও জানান, বর্তমানে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪০টির মতো চারকোল ফ্যাক্টরি আছে। তবে আমাদের এ শিল্পের জন্য অর্থের বিষয়টি সরকারকে দেখতে হবে। আমাদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা ও ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ চারকোল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মির্জা জিল্লুর রহমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, চারকোল শিল্পকে একটি উদীয়মান শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও পাটজাত পণ্য হিসেবে ২০ ভাগ ক্যাশ ইনসেনটিভ পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ শিল্প বিকাশে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সুযোগ দিতে হবে। এ শিল্পের জন্য দ্রুত পৃথক নীতিমালা তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া এ শিল্পের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা ও ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
