‘আর ভিক্ষা করব না মা, লজ্জা লাগে’

‘আর ভিক্ষা করব না মা, লজ্জা লাগে! ভিক্ষা ছেড়ে ব্যবসা করে খাবো। লোকে গাল দেয়, বকাবকি করে। ব্যবসা করে খাবো।’- এভাবেই কথাগুলি প্রতিবেদককে জানালেন বিশালের মা মুসলিমা (৪০)।

নিজের নামটা কোনোরকম খুব কষ্টে বলতে পারলেও বাকি কথা বোঝালেন ইশারায়। মায়ের কাছেই তিনি বলেন তার সকল সুখ-দুঃখের কথা।

জন্মগত প্রতিবন্ধী বিশাল। হাত-পা কোনোটাই ঠিকভাবে কাজ করে না। কথাও বলতে পারেন না তিনি। অধিকাংশ সময় ইশারাতেই চালান কথোপকথন।

নগরীর উপকন্ঠ বসুয়া জামে মসজিদের পাশেই তার বাড়ি। দাদির কাছে থেকে পাওয়া অর্ধেক কাঠা জমিতে টিনের চালায় তাদের বসবাস। বাড়ি করতেও নিতে হয়েছে তাদের ঋণ। সেই ঋণও ভিক্ষাবৃত্তির টাকায় পরিশোধ করেছেন বিশাল।

পিতা বাহার আলী লিখন (৪৭) পেশায় রিকশাচালক। তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র আয়রোজগার করা ব্যক্তি। শারীরিক অচলবস্থার কারণে তিনি এখন শয্যাগত।

প্রতিবন্ধী বিশালের মা মুসলিমা জানান, গত ১০-১২ বছর ধরে পাইলস ও লিভারজনিত সমস্যায় বিশালের বাবা ছেড়েছেন সংসারের হাল। মলদ্বার থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে চালাতে পারেন না রিকশা। আবার কিডনি-লিভারের সমস্যার বেঁচে থাকাই যেন দায় হয়েছে তার। ক্ষুধার যন্ত্রণা ও পরিবারের দূর্দশা আর সহ্য না হওয়ায় ভিক্ষার থালা হাতে রাস্তায় নামে বিশাল।

তার মা জানায়, তিন ভাই-বোনের মধ্যেই বিশালই সবার বড়। তাই সংসারের ঘানি টানার দায়টাও যেন তার। পরিবারের অনাহার ও দুঃখকষ্ট সইতে না পেরে প্রায় ৮ বছর যাবৎ করেছেন ভিক্ষার কাজ।

তবে বিশাল তার মাকে জানিয়েছেন, তিনি আর ভিক্ষা করবেন না। বাজারের এক ব্যক্তি তাকে বিভিন্ন মালামাল দেয় রাস্তায় ঘুরে ব্যবসা করার জন্য। এলাকার এক যুবক ওই মালমাল বিক্রির জন্য দিয়েছেন একটি সাউন্ড বক্স। যেখানে রয়েছে তার বিজ্ঞাপনের প্রচার। সাউন্ড বক্সটি ছেড়ে হাসিমুখে রাস্তায় ঘুড়ে ব্যবসা করছেন বিশাল।

কখনও খাতা-কলম, কখনও বা মোবাইলের স্ট্যান্ড ও রকমারি মালামাল বিক্রি করেন তিনি। দিন শেষে মালামাল ও বিক্রির টাকা তুলে দেন মালিককে। সেখান থেকে নেন নিজের লাভের টাকা। আয় হয় ২০০-৩০০ টাকা। তাতেই তিনি মহা খুশি।

বিশালের মা জানান, ৫-৬ মাস হয়েছে বিশালের ভিক্ষা ছাড়ার। ভিক্ষায় সম্মান নেই। লোকের গাল-মন্দ ধিক্কার শুনতে হয়। তাই আগামীতে ব্যবসা করেই খেতে চান তিনি। এজন্য সমাজের ধনী ব্যক্তিদের সাহায্য চেয়েছেন বিশাল।

বাড়ির পাশেই দোকান করে ব্যবসা করার ইচ্ছে তার। আপাতত বাজার থেকে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে বেচে যা আয় হয় তাতেই সামান্য ডাল-ভাত হয় তাদের।

মেজো বোন ও ছোট ভাই উভয়ই পড়াশোনা করেন। তাদের পড়াশোনার খরচও বহন করতো বিশাল। তবে করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধা থাকায় লাগছে না টাকা। তবে মেজো বোনটাকে পড়িয়ে চাকরি করানোর ইচ্ছে তার।

বিশাল সমাজসেবা অফিস থেকে পান সামান্য কিছু প্রতিবন্ধী ভাতা। দুবছর আগে সাদের আলী নামের একজন দিয়েছিলেন বিশালকে হুইলচেয়ার। চলাফেরায় সমস্যা হওয়ায় টয়লেট করতেও পারেন না তিনি। তার বাসায়ও নেই একটি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার।

বিশালের মায়ের অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামী অসুস্থ ও বেকার। ছেলে প্রতিবন্ধী। শাশুড়ীর বয়স ৮০ বছরের ওপরে তারপরও বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত আমরা। ৮০ বছরের বৃদ্ধাকে দেয় না বয়স্কভাতা। সরকারের দেয়া ১০ টাকার দরের চালও পাই না আমরা।

তিনি আরও বলেন, অনেক কষ্ট করে বহুবার কাউন্সিলর ও চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছি কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। সহযোগিতা না দিয়েই তারা অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে বার বার। জাগো নিউজ।