বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে বরগুনায় রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটক চার যুবককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হত্যার ঘটনায় তাঁদের সম্পৃক্ততা পায়নি পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) রাত সাড়ে ৮টার দিকে বরিশাল লঞ্চঘাট থেকে চার যুবককে আটক করে কোতোয়ালি মডেল থানা-পুলিশ। এই চার যুবক এমভি মানামী লঞ্চে করে বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হচ্ছিলেন। লঞ্চ ছাড়ার আগেই তাঁদের আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। দিবাগত রাত তিনটার দিকে তাঁদের ছেড়ে দেয় পুলিশ। বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, চার যুবকের বাড়ি বরগুনায়। আটকের পর তাঁদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় তাঁরা সম্পৃক্ত নয়। তাঁরা এই হত্যা মামলার আসামিও নন। তাই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত রিফাতের বাবা বুধবার ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করে বরগুনা সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
বুধবার বরগুনা শহরের কলেজ সড়কের ক্যালিক্স কিন্ডারগার্টেনের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকার সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনার ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, রিফাত শরীফের (২৫) মৃত্যুর ঘটনায় বরগুনা জেলা জুড়ে চলছে শোকের মাতম। রিফাতকে এক নজড় দেখতে তার বাড়িতে বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছে হাজারো মানুষ। বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) বিকাল সাড়ে ৫ টায় রিফাতের বাড়িতে জানাজা নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। রিফাতের মরদেহ নিয়ে বরিশাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স যোগে বরগুনায় নিজ বাড়ি সদর উপজেলার ৬ নম্বর বুড়িরচর ইউনিয়নের উত্তর বড়লবনগোলা গ্রামে দুপুর তিনটার দিকে এসে পৌঁছে। এর আগে বুধবার (২৬ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় দিনে দুপুরে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে প্রকাশ্যে স্ত্রীর সামনে রিফাতকে কুপিয়ে জখম করে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগীরা।
গুরুতর আহত রিফাতকে প্রথমে বরগুনা সদর হাসপাতালের পরে বরিশাল শেরে-ই বাংলা মেডিকেল (শেবাচিম) কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এরপরে সেখানে বিকাল সোয়া ৪টার দিকে অপারেশন থিয়েটারে অস্ত্রোপচারের সময় রিফাতের মৃত্যু হয়।
বরগুনায় রাস্তায় ফেলে প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত শরীফ (২৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার সময় পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলো দর্শক নয়, তারাই প্রথমে হামলা করেছে বলে জানিয়েছেন নিহত রিফাতের নববধূ আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি।
বুধবার এ হত্যাকাণ্ডের সময় রিফাতের পাশেই ছিলেন তার নববধূ আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। তিনি খালি হাতেই খুনিদের নিবৃত করার চেষ্টা করেন। এ সময় হামলাকারীদের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি হয়েছে। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু ঠেকাতে পারেননি। মিন্নি কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু ফিরাইতে পারি নাই।’
ওই ঘটনার সময় আশেপাশে অনেকই ছিলেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। এরমধ্যে একজন ঘটনাটি ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট করেন। সেই পোস্টটি ভাইরাল হয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, রিফাতকে যখন সন্ত্রাসীরা কোপাচ্ছিল তখন তাদের খুব কাছেই কয়েকজন যুবক দাঁড়িয়েছিল। এ দৃশ্য দেখে সবাই প্রশ্ন তুলেছেন ওই ছেলেগুলো কেন এগিয়ে আসেনি। অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোর শরীরী অঙ্গভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। কারণ ঘটনার সময় ছেলেগুলোকে খুব স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এজন্য অনেকের প্রশ্ন, ছেলেগুলো জনসাধারণ হলে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পাড়ত না। হয় রিফাতকে বাঁচাতে এগিয়ে আসত, না হয় ভয়ে পালাত।

প্রকাশ্যে এমন হত্যাকাণ্ডের সময় স্ত্রী ছাড়া রিফাতকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে না আসায় হাইকোর্ট পর্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
এদিকে বুধবারের সেই নৃশংস ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি বৃহস্পতিবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কলেজ দিয়ে বের হইছি, ও (রিফাত) আমার সঙ্গে ছিল। তখন কিছু পোলাপান আইসা কী জানি বলা শুরু করছে, ‘গালি দিছো ক্যান, গালি দিছো ক্যান?’ এ রকম জানি কী…। পরে আরও দু-তিনটা ছেলে আইসা কোপান শুরু করছে। আমি অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু ফিরাইতে পারি নাই।’
আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি আরও বলেন, ‘দিন-দুপুরে যারা এমন করে, আমি তাদের সুষ্ঠু বিচার চাই। তাদের যেন শাস্তি হয়।’
মিন্নি আরও বলেন, ভিডিওতে যাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে ছেলেগুলো দর্শক নয়, মূলত তারাই প্রথমে রিফাত ও আমার পথ আটকে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে তিন-চারজন রিফাতকে মারতে শুরু করেছিল। নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী চাপাতি দিয়ে রিফাত শরীফকে কোপাতে শুরু করলে তারা পাশে দাঁড়িয়ে দেখেছিল। এর পর আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেও রিফাত শরীফকে বাঁচাতে পারিনি।
