উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার জেরে একেবারে ধরাশায়ী হয়ে পড়েছে দেশটির অর্থনীতি। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের একটি ভীতিকর তথ্য দিয়ে বলেছে, এ অবস্থা অদূর ভবিষ্যতে চলতে থাকলে তা দেশটির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাই নয় বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ খরা। আর এ কারণে তাদের খেসারত দিতে হচ্ছে অর্থনীতিতে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু পিয়ংইয়ংয়ের একগুঁয়ে মনোভাবের কারণেই তাদের অর্থনীতিতে এই বাজে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে খুব স্বাভাবিকভাবেই মানুষের জীবনযাত্রার মান আরো অনেক নিচে নেমে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ব্যাংক অব কোরিয়া) জানায়, গত বছর দেশটির জিডিপি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সংকোচন হয়েছে, যা বিগত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। আরো পরিষ্কার করে বললে সেই ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে কম বলে সিউলের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে দেশটির জিডিপি ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর গত বছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া ১৯৯৭ সালে সেখানে মারাত্মক দুুুর্ভিক্ষ আঘাত হেনেছিল। কিন্তু গত বছরে অর্থনীতির যে সূচক এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে দেখা যায় দুর্ভিক্ষের সময়কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, উত্তর কোরিয়া কখনোই তাদের অর্থনৈতিক বিষয়ের ওপর কোনো তথ্য-উপাত্ত জনসম্মুখে প্রকাশ করে না। কারণ দেশটি সবসময়ই বহির্বিশ্ব থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখে। তাদের গুটিকয়েক যে বন্ধুরাষ্ট্র পাশে ছিল তা ছিল মূলত ব্যবসায়িক স্বার্থে। এর বাইরে তারা কখনোই অন্য দেশের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে না। নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা এই দেশটি মূলত অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়ে পারমাণবিক অস্ত্রে নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতেই বেশি পছন্দ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস কোঅর্ডিনেশন টিম জানায়, আন্তর্জাতিক এ অবরোধ বেশি শক্তিশালী ছিল গত বছরে। এ সময়ই তাদের বাহ্যিক বাণিজ্য ভলিউম বেশি কমে আসে। বিশেষ করে কয়লা, স্টিল, মাছ, টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে তাদের অর্থনীতি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে করে ঠিক কি পরিমাণে তাদের শিল্প উত্পাদন কমেছে সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে উত্তর কোরিয়ার গত বছরের মোট দেশজ উত্পাদন এর আগের বছরের চেয়ে কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই সংকোচনকে এ যাবত্কালের সবচেয়ে বড় ধরনের হ্রাস বলে অভিহিত করা হয়েছে। অবশ্য উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতির এই সংকোচনের পিছনের কারণ হলো গত বছর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়ার প্রধান প্রধান পণ্য রফতানি নিষিদ্ধ করে দেয়। আর এ কারণে তারা অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়ে। বিশেষ করে কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে তাদের নগদ অর্থের প্রাপ্তিতে বাধা আসে। ফলে তারা অর্থনীতিতে বেশ দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। সেসময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধরে নেয় অনড় উত্তর কোরিয়াকে দমাতে আন্তর্জাতিক অবরোধের কোনো বিকল্প নেই। আর এতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকে দক্ষিণ কোরিয়া। উভয়ের প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য সিদ্ধান্তের কারণেই উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে তা মারাত্মক প্রভাব ফেলে। উত্তর কোরিয়া তাদের প্রতি আরোপিত এ নিষেধাজ্ঞাকে ‘দুষ্টচক্রের’ খেলা বলে উল্লেখ করে। কিন্তু তাতেও দমাতে পারেনি পিয়ংইয়ংকে। তারা বরং আরো হুমকি দেয় যে, তাদের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক দা-কুমড়া সম্পর্কে পরিণত হয়। অবশেষে চলতি বছরে এসে পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টে যায়। এসময়ে পিয়ংইয়ং-ওয়াশিংটন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরিতে অনেক কথাবার্তা উঠে। এ নিয়ে অনেক দেশ তখন মধ্যস্থতার ভূমিকায়ও এগিয়ে আসে। একপর্যায়ে দুই দেশের মাঝে উত্তেজনার পারদ কমতে থাকে। শেষপর্যন্ত সিঙ্গাপুরে দুইদেশের মাঝে আলোচনা হয়। আর এরপর থেকেই বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির অনেকটা লাঘব হতে থাকে। বাগযুদ্ধ কিংবা যুদ্ধের হুমকি ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে। যুদ্ধের দামামা উভয়ের মাঝে কমতে থাকলেও অবরোধের যে ক্ষতি উত্তর কোরিয়ার উপরে গিয়ে পড়েছে তা থেকে তাদের মুক্তি মেলেনি। তারই পরিণতি আজকের উত্তর কোরিয়ার নাজুক অর্থনীতি।
এবার দেখা যাক, উত্তর কোরিয়ার আয়ের উত্সগুলো কি। কিংবা কি কি খাত থেকে তারা তাদের আয় করে থাকে। এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ উত্তর কোরিয়া কখনোই তাদের আয়ের উত্স প্রকাশ করে না। শুধু তাই নয়, দেশটি থেকে যে কোনো তথ্য সংগ্রহ করাই কঠিন কাজ। তবে এক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু তথ্য-উপাত্ত দিয়ে উত্তরের অর্থনীতির হালহকিকত জানায়। তাদের তথ্যের উত্স বিভিন্ন দেশের সরকারি সংস্থা, নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। উত্তর কোরিয়ার আয়ের একটা বড় ধরনের উত্স বলা যেতে পারে চীন। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার নিয়ন্ত্রিত কোরিয়া ট্রেড-ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সির হিসাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া চীনে কয়লা, খনিজদ্রব্য, পোশাক ও কিছু খাদ্য সামগ্রী রপ্তানি করে। আর চীন থেকে আমদানি করে পেট্রোলিয়াম গ্যাস, ইস্পাত, যন্ত্রাংশ, গাড়ি ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী। তাই ব্যবসায়ীক স্বার্থের কথা যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে বলতে হবে ভবিষ্যতে আবারো যদি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেয় তাহলে চীন তা কীভাবে নেবে সে সম্পর্কে ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া উত্তর কোরিয়ার সরকারের যদি নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাহলে সীমান্তে যে শরণার্থীর ঢল নামতে পারে তা চীন ভালোভাবেই জানে।
